হযরত হুদ (আঃ), দুর্ধর্ষ আদ জাতি এবং আল্লাহর আযাব।

হযরত হুদ (আঃ), দুর্ধর্ষ আদ জাতি এবং আল্লাহর আযাব।

আল্লাহ যতগুলো জাতিকে গজব দিয়ে ধ্বংস করেছেন তার মধ্যে আদ জাতি অন্যতম।আদ জাতি ছিল দুর্ধর্ষ, শক্তিশালী এবং একই সাথে সম্পদশালী। তারা লম্বায় ছিল যে কারও চেয়ে বেশি, তাদের ছিল পেশীবহুল শরীর, তাদের হাড়ের গড়ন ছিল যে কারও চেয়ে শক্ত, এককথায় তারা ছিল অনন্য-তাদের সময়ে তাদের সাথে তুলনা করার মত আর কেও ছিলনা। কোরআনে তাদের স্বাতস্ত্র্য অতন্ত্য পরিষ্কার ভাষায় ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেঃ এমন দীর্ঘকায় ও শক্তিশালী জাতি ইতিপূর্বে পৃথিবীতে সৃজিত হয়নি। তারা ছিল ধ্বংসাত্মক মানষিকতার। তারা যাদের উপর আক্রমণ করত তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলত। তাদের ছিল বিশাল সৈন্যবাহিনী। এতই বিশাল যে সৈন্যবাহিনীর সামনের অংশ বিপক্ষদলকে যখন আক্রমণ করত পেছনের অংশ তখনও শহরের গেইট পার হতে পারত না। হযরত হুদ (আঃ) ছিলেন এই জাতির জন্য আল্লাহর প্রেরিত নবী।

একই সাথে তারা স্থপতি বিদ্যায় পারদর্শী ছিল, পাহাড় কেটে এরা বড় বড় অট্রালিকা তৈরি করেছিল। তারা ইহকাল নিয়ে মত্ত থাকত।তারা মরু অঞ্চলকে জলসেচ করে উর্বর ভূমিতে রুপান্তর করেছিল। অঞ্চলটি ছিল শষ্য-শ্যামল ও সবুজ বাগানে পরিপূর্ণ। মহান আল্লাহ তায়ালার এত নিয়ামত সত্তেও তারা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বিকার করত। তারা ছিল অহংকারী।

এরা ছিল হযরত নূহ (আঃ) এর বংশধর।হযরত নূহ (আঃ) এর সময়কালে মহা প্লাবনে সব কাফের ধ্বংস হয়ে যায় এবং দুনিয়াতে শুধু ইমানদাররাই অবশিষ্ট থাকে।এরপর এই আদ জাতিই প্রথম কুফুরি ও শিরিকিতে লিপ্ত হয়। হযরত নূহ (আঃ) এর পুত্র সাম। সাম এর পুত্র ইরাম, ইরামের পুত্র আউস এবং আউসের পুত্র ছিল আদ। অন্যদিকে সামের আরেক পুত্র ছিল আবির, আবিরের পত্রের নাম ছিল ছামুদ। পরে আদ এবং ছামুদের নামে তাদের বংশের নামকরন করা হয়- কওমে আদ আর কওমে ছামুদ। এরা প্রথম আদ এবং দ্বিতীয় আদ জাতি হিসাবে পরিচিত। এটি আরবের প্রাথমিক যুগের একটি জাতি।

Ad City
এখনকার ম্যাপে আদ রাজ্য।

আদ সম্প্রদায়ের ১৩ টি পরিবার বা গোত্র ছিল। আম্মান ( বর্তমান জর্ডান এর বৃহত্তম শহর ও রাজধানী ) থেকে শুরু করে হাযারামাউত ও ইয়েমেন পর্যন্ত তাদের বসতি ছিল। কয়েকশত বছর তারা আধিপত্য বিস্তার করে। মহান আল্লাহকে ভুলে তারা চার দেবতার পূজার্চনা শুরু করে। দেবতা চার হল- সাকিয়া, হাফিজা, রাদিকা এবং ছালিমা। তারা বিশ্বাস করত সাকিয়া বৃষ্টি, ফসল এবং অর্থদানকারী দেবতা, হাফিজা হল বিপদ, রোগ এবং অমঙ্গল থেকে মুক্তিদানকারী দেবতা, রাদিকা হল অন্ন, শান্তি এবং পরকালের মুক্তিদানকারী দেবতা, ছালিমা হল স্বাস্থ্য, শক্তি এবং যুদ্ধবিজয় দানকারী দেবতা।

এমনসময় মহান আল্লাহ তায়ালা আদ জাতির হেদায়েতের জন্য হযরত হুদ (আঃ) কে তাদের কছে নবী হিসেবে প্রেরন করেন। তিনি ছিলেন আদ বংশীয়। আল্লাহ-তায়ালা পবিত্র কোরআনে একথা উল্লেখ করেন। তিনি তার জাতিকে যখন হেদায়েতের দাওয়াত দিলেন তখন তারা নবীর কথা শুনে ঠাট্টা-বিদ্রুপ আরম্ভ করল। তারা তাকে বিশ্বাস করল না। তারা প্রমান চাইল। তারা বলল, তোমার কথায় ত আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের ধর্ম বাদ দিতে পারিনা। অথচ তারা ভুলে গেল মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগের মহা প্লাবনের কথা। তারা হযরত হুদ (আঃ) কে নির্বোধ আখ্যা দিল এবং মিথ্যাবাদী বলল। হযরত হুদ (আ) তাদেরকে আযাবের ভয় দেখালেন। তারা বলল তুমি যদি সত্যবাদী হও নিয়ে আস আযাব। আমরা আযাবের ভয় করিনা, আমরা শক্তিশালী। আযাবের মোকাবেলা আমরা করব। তবুও আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করবনা।

আদ জাতি যখন হযরত হুদ (আঃ) কে অগ্রাহ্য করল তখন নবী তাদের জন্য বদদোয়া করলেন। আল্লাহ নবীর বদদোয়া কবুল করলেন। টানা তিন বছর কোন বৃষ্টি হল না। তাদের মাঠ-ঘাট, নদি-নালা, বিল সব শুকিয়ে গেল। পুরা আদ জাতির উপর নেমে এল দুর্ভিক্ষ। অনাহারে, অর্ধাহারে মানুষের দিন কাটতে লাগল। রাস্তা-ঘাটে মানুষের লাশ পরে থাকতে দেখা গেল। হাহকার শুরু হয়ে গেল। মানুষ অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে জীবন ধারনের চেষ্টা করতে লাগল।

আদ জাতির মোট লোকসংখ্যা ছিল এক লক্ষ। মাত্র ৭০ জন মানুষ নবীর অনুসারী হয়েছিল। তারা নবীর কাছে আরজ করল- হে আল্লাহর নবী! দেশব্যাপী যে হারে দুর্ভিক্ষ হচ্ছে তাতে আমরা ও আমাদের আপনজনেরা কেও রেহাই পাবনা। অতএব, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, আল্লাহ যেন গজব উঠিয়ে নেয়। আমরা আবার আপ্রান চেষ্টা করব সবাইকে আল্লাহর পথে আনার। নবী দোয়া করলেন। বৃষ্টি হল। আবার ফসল উৎপাদিত হল। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করল এবং স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে লাগল। নবী আবার তাদের দাওয়াত দিলে তারা পরিস্কার বলে দেয় তারা কোনদিনই দাওয়াত কবুল করবেনা। বার বার নবী দাওয়াত পেশ করেন এবং আযাবের ভয় দেখান কিন্তু তারা ইমান আনলনা। বরং তারা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। নবী তাদের আচার আচরন দেখে আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন।

আল্লাহর তরফ থেকে জানিয়ে দেয়া হল, হে নবী আপনি আপনার ৭০ জন উম্মতকে নিয়ে শহর থেকে বেরিয়ে যান এবং পাহাড়ে আশ্রয় নিন। আপনি অতি শীঘ্রই তাদের উপর ঝড় ও বন্যার আযাব প্রেরন করছি। নবী তার কওমকে সতর্ক করলে তারা মোটেও কর্ণপাত করলনা। তারা বলল, হে হুদ (আ), তোমার আল্লাহ ঝড় ও বন্যার আযাব পাঠিয়ে আমাদের দুর্বল করতে পারবেনা। আমরা আমাদের কৌশল ঠিক করে রেখেছি। বরং তুমি যদি আমাদের আযাব থেকে রেহাই পেতে চাও তাহলে তোমার নব্যুয়তির দাবী ত্যাগ করে আমাদের মাঝে বসবাস কর, না হয় অতি সত্তর শহর ত্যাগ কর। আগামী দিন যেন তোমাদেরকে আর এই শহরে না দেখি।

নবী তার উম্মতদের নিয়ে শহর ত্যাগ করলেন, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ি এলাকায় পৌছেন এবং গুহায় ঢুকে আশ্রয় নেন। অতপর মহান আল্লাহ তায়ালা ফেরেস্তাদের আদেশ দিলেন ঝড়ের সামান্য নমুনা আদ জাতির উপর প্রেরন করার জন্য। আদ জাতি ঝড় দেখে খুশি হল, তারা ভাবল তাদের দেবতা তাদের উপর খুশি হয়ে বৃষ্টি দিচ্ছে, হযরত হুদ (আ) গোত্র ত্যাগ করায় তাদের দেবতা খুশি হয়ে তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করছে। বৃষ্টির শুরুতে তারা তাদের গৃহে অবস্থান নিল কিন্তু ঝড়ের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে তারা পলায়ন করল এবং পাহাড়ে আশ্রয় নিল। টানা আট দিন ঝড়-ঝঞ্চা চলল। এমন ঝড় এই পৃথিবী আগে কখনও দেখেনি। তারা তাদের স্ত্রি-সন্তানদের মাঝখানে রেখে চারদিকে বেরিকেড দিল। কিন্তু ঝড় কাওকেই রেহাই দিল না। সুউচ্চ দালান-কোঠা, বাড়ি ঘর, মানুষের লাশ এখানে সেখানে পরে থাকল। পুরো জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। বর্তমানে এই এলাকাটি আরব মানচিত্রে রবউলখালি বা জনশূন্য ভুখন্ড নামে পরিচিত। জনমানবহীন মরুপ্রান্তর আজও আদ জাতির নাফরমানির সাক্ষি হিসেবে পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান।

যারা নবীর উপর আস্থাশীল ছিল শুধু তারাই রক্ষা পেল। কথিত আছে একদল ইমানদার ব্যক্তি উক্ত এলাকায় ছিল যারা কিছুই জানতে পারেনি। ঝড়ের বাতাস তাদের স্পর্শ করেনি। জীবিত উম্মতেরা দেশের পরিস্থিতি দেখে অবাক হল এবং তারা কালবিলম্ব না করে নবীর নিকট পরিপূর্ণ ইমান আনল। হযরত হুদ (আ) ৪০০ বছর বেচে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ১০০ বছর ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম ছিল।

ইউটিউবে এই ভিডিও টি দেখতে চাইলে এই লিংকে যান। ভিডিও ভাল লাগলে সাবস্ক্রাইব করতে এবং লাইক দিতে ভুলবেন না।

আমার এই লেখা যদি আপনাদের ভাল লেগে থাকে কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করতে ভুলবেন না। আপনার মূল্যবান কমেন্ট আমাকে আরও লিখতে উৎসাহিত করবে।

ধন্যবাদ সবাইকে।

পোষ্টটি ভাল লাগলে আপনার ফেসবুকে শেয়ার করতে ভুলবেন না। নিচের ফেসবুক শেয়ার বাটনে ক্লিক করে সহজেই শেয়ার করুন।

আমার লাখা ইসলামিক আরও ব্লগ পড়ুন।


12 responses to “হযরত হুদ (আঃ), দুর্ধর্ষ আদ জাতি এবং আল্লাহর আযাব।”

  1. এই রকম পোষ্ট আরও চাই। ধন্যবাদ সুন্দর এই লিখাটির জন্য ।

    • ধন্যবাদ kazi আপনাকে। আপনার কমেন্ট আমাকে উৎসাহিত করবে এধরনের পোষ্ট লেখার ব্যাপারে।

    • ধন্যবাদ SHAMIM ভাই। আপনাদের ভাল লাগাই আমার কাম্য। আশা করি মাঝে মাঝে আমার ব্লগে ঢু মারতে ভুলবেন না।

  2. ভাই আদ জাতির লোকসংখ্যা যদি এক লক্ষ হয় তাহলে তাদের বাহিনী এতো বড় কিভাবে হয় যে তার সম্মুখভাগ যুদ্ধে লিপ্ত আর শেষভাগ শহরের দরজা পার হয় নাই?
    কোরআন, হাদিসের বাইরে থেকে বর্ননা দেবার সময় সাবধান থাকতে হবে।
    আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করু।

    • ধন্যবাদ। ব্যাপারটা আমিও এভাবে চিন্তা করি নাই। মোট জনসংখ্যার ব্যাপারটা অথবা সেনাবাহিনীর সংখ্যা ভুল আছে। ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকব।

    • ধন্যবাদ MD SHAHAB UDDIN ভাই। আপনাদের কমেন্ট আমাকে উৎসাহিত করবে। সাথে থাকুন।

Leave a Reply