কালোজিরার ঔষুধি গুণাগুণ

রোগ বালাই আমাদের এখন নিত্য দিনের সঙ্গি। তবে বিভিন্ন রোগ সহ মানুষের নানান শারীরিক সমস্যা নতুন নয়৷ সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ এগুলোর সাথে পরিচিত। বর্তমান আধুনিক চিকিৎসার আগে মানুষ প্রকৃতির ভরসাতেই চিকিৎসা করতো। এবং তারা তখন সফলও ছিলো বটে৷ আধুনিক বিজ্ঞানের ফলে সেই চিকিৎসা হারানোর পথে থাকলে কিছু কিছু প্রাকৃতিক জিনিস এখনো নানা ধরনের সমস্যার সমাধান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের মধ্যে কালোজিরা অন্যতম। কালোজিরা শুধু ছোট ছোট কালো দানা নয়, কালোজিরার ঔষুধি গুণাগুণ – এক বিস্ময়কর শক্তি। প্রাচীনকাল থেকে কালোজিরা মানবদেহের বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক।

কালোজিরা কী

কালোজিরা সাধারণত একটি মৌসুমী গাছ যার আকার মাঝারি।এতে মাত্র একবার ফুল ও ফল হয়। বৈজ্ঞানিক নাম দেয়া হয়েছে Nigella Sativa Linn। এর স্ত্রী, পুরুষ দুই রকমের ফুল হয়, রং সাধারণত হয় নীলচে সাদা (জাত বিশেষে হলুদাভ), পাঁচটি পাঁপড়ি বিশিষ্ট । কিনারায় একটা বাড়তি অংশ থাকে। তিন-কোনা আকৃতির এর বীজ হয় যা দেখতে কালো । ফল দেখতে গোলাকার হয় এবং প্রতিটি ফলে ২০-২৫ টির মত বীজ থাকে । আয়ুর্বেদীয় , ইউনানী, কবিরাজী ও লোকজসহ বিভিন্ন চিকিৎসায় ব্যবহার হয়।

কালোজিরার ঔষুধি গুণাগুণ
কালোজিরা গাছ

এটি পাঁচ ফোড়নের একটি উপাদান যা মশলা হিসাবে ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। বীজ থেকে উৎপদন করা যায় তেল। গবেষকদের মতে, কালোজিরায় রয়েছে ফসফেট, লৌহ, ফসফরাস, কার্বো-হাইড্রেট সহ বিভিন্ন উপকারি উপাদান।

কালোজিরা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ব্যাখ্যা

অন্যান্য সব ভেষজের মতো কালোজিরার ঔষুধি গুণাগুণ নিয়েও গবেষণা গবেষণা হয়েছে। ১৯৬০ সালে মিসরের গবেষকরা জানান যে, কালিজিরা নাইজেলনের কারণে হাঁপানি উপশম হয়।

জার্মানি গবেষকরা দাবি করেছেন, কালোজিরার অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-মাইকোটিক প্রভাব রয়েছে। এটি বোনম্যারো ও প্রতিরক্ষা কোষগুলোকে উত্তেজিত করে এবং ইন্টারফেরন তৈরি বাড়িয়ে দেয়।

আমেরিকার গবেষকরা প্রথম কালিজিরার টিউমারবিরোধী প্রভাব সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন।  । পারকিনসন্স রোগের প্রতিকারে, কালিজিরায় থাইমোকুইনিন থাকে যা পারকিনসন্স ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের দেহে উৎপন্ন টক্সিনের প্রভাব থেকে নিউরনের সুরক্ষায় কাজ করে।

ক্ষতিকর জীবাণু নিধন থেকে শুরু করে শরীরের কোষ ও কলার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে কালোজিরা। Medical Science Monitor Journal এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, নিয়মিত কালিজিরা খেলে মৃগীরোগ, শিশুদের হৃৎপিন্ডের অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে। কালিজিরায় খিঁচুনি বন্ধ করার উপাদান থাকে।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিরাময় করে। গবেষণায় পাওয়া গেছে, প্রতিদিন ২ গ্রাম কালিজিরা খেলে রক্তের সুগার লেভেল কমায়, ইনসুলিনের বাঁধা দূর করে এবং অগ্নাশয়ে বিটা কোষের কাজ বাড়ায়।

কালিজিরা একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট। এটি সহজেই শরীরের রোগ-জীবাণু ধ্বংস করে দিতে পারে। এ অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদানের জন্য দেহের ঘা, ফোঁড়া কম সময়েই সেরে যায়।

একদিকে প্রস্টেটজনিত সমস্যা সে সাথে কিডনিজনিত রোগে কম বেশি বয়স্করা পা ফোলা সমস্যায় ভোগেন। কালোজিরা তাদের এ সমস্যা রুখতে পারে সহজেই। প্রত্যেকের রান্নাঘরেই কালোজিরা থাকে যা খাবারকে সুবাসিত করে।

তবে বিজ্ঞানিরা বলেছেন এর গুণাগুণ লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বেশি এর তেলে।  কালিজিরা খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে পারে এবং রক্তচাপ কমিয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় রাখতে পারে যা পরিক্ষিত সত্য।

কালোজিরায় আর কি কি উপকারিতা রয়েছে-

করোনা প্রতিরোধে কালোজিরা

করোনাকালে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বৃদ্ধি করা। কালোজিরা ক্ষতিকর জীবাণু থেকে শরীরকে রক্ষা করার পাশাপাশি এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে থাকে।  এক চা চামচ কালোজিরা বাটা, সমপরিমাণ আদার রস ও মধু মিশিয়ে দিনে দুই কি তিন বার খান। সকালে খালি পেটে পানির সঙ্গে খেলে  বেশি উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে এভাবে খেতে কষ্ট হলে ভর্তা বানিয়ে গরম ভাতেও খেতে পারেন কালোজিরা। তাছাড়া তরকারিতে বা টকদই দিয়েও কালোজিরা খেতে ভালোই লাগে। আর চা বানিয়ে পান করার ত বিকল্পই নাই।

মাথাব্যথা কমাতে কালোজিরা

মাথাব্যথার সময়ে কপালে উভয় চিবুকে ও কানের পার্শ্ববর্তী স্থানে দৈনিক ৩-৪ বার কালোজিরার তেল মালিশ করুণ। তিন দিন খালি পেটে চা চামচে এক চামচ করে তেল পান করুন উপকার পাবেন।

যৌন দুর্বলতায় কালোজিরা

কালোজিরা চুর্ণ সাথে অলিভ অয়েল, ৫০ গ্রাম হেলেঞ্চার রস ও ২০০ গ্রাম খাঁটি মধু একসঙ্গে মিশিয়ে সকালে খাবারের পর এক চামুচ করে খান। এতে গোপন শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

চুলপড়া রোধে কালোজিরা

লেবুর দিয়ে মাথার খুলি ভালোভাবে ঘষুণ। ১৫ মিনিট পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন ও ভালোভাবে মাথা মুছে ফেলুন। তার পর মাথার চুল ভালোভাবে শুকানোর পর সম্পূর্ণ মাথার খুলিতে কালোজিরার তেল সুন্দর ভাবে দিয়ে দিন। এতে এক সপ্তাহখানেকের মধ্যে চুলপড়া কমে যাবে।

কফ ও হাঁপানি রোধে কালোজিরা

বুকে ও পিঠে কালোজিরার তেল মালিশ করতে পারেন । এতে হাঁপানিতে উপকারী অন্যান্য মালিশের সঙ্গে এটি মিশিয়েও নেয়া যেতে পারে।

স্মৃতিশক্তি বাড়ে ও অ্যাজমায় উন্নতি ঘটে

এক চামচ মধুর সাথে একটু কালোজিরা দিয়ে খেয়ে ফেলুন। এতে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। হালকা উষ্ণ পানিতে কালোজিরা মিলিয়ে ৪৫ দিনের মতো খেলে অ্যাজমার সমস্যার উন্নতি ঘটে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে সহায়ক কালোজিরা

কালোজিরার চূর্ণ এর সাথে ডালিমের খোসা চূর্ণ মিশ্রণ এবং কালোজিরার তেল ডায়াবেটিসে খুবই উপকারী।

মেদ ও হৃদরোগ সারাতে কালোজিরা

চায়ের সঙ্গে নিয়মিত কালোজিরা মিশিয়ে অথবা এর তেলের সাথে মিশিয়ে পান করলে হৃদরোগে যেমন উপকার হয়, তেমনি মেদ কমে যায়।

অ্যাসিডিটি ও গ্যাস্টিক রোধে কালোজিরা

এক কাপ দুধ ও এক টেবিল চামুচ কালোজিরার তেল মিশিয়ে দৈনিক তিনবার ৫-৭ দিন সেবন করতে হবে।দ এতে গ্যাস্টিক কমে যেতে পারে৷

চোখে সমস্যা সারাতে কালোজিরা

রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে চোখের উভয়পাশে ও ভুরুতে কালোজিরার তেল মালিশ করুণ। এক কাপ গাজরের রসের সাথে এক মাস কালোজিরা তেল সেবন করুন।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে কালোজিরা

যখনই গরম পানীয় বা চা পান করবেন, তখনই কালোজিরা মিশিয়ে নিবেন। গরম খাদ্য বা ভাত খাওয়ার সময় কালোজিরার ভর্তা খান রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকবে। এ ছাড়া কালোজিরা, নিম ও রসুনের তেল একসাথে মিশিয়ে মাথায় ব্যবহার করুণ। এটি ২-৩ দিন পরপর করা যায়।

জ্বর উপশমে কালোজিরা

জ্বর হলেই প্যারাসিটামল না খেয়ে একটু ধৈর্য ধরা উচিত৷ কারণ আমাদের বেশির ভাগ জ্বরই সাধারণ জ্বর হয়ে থাকে৷  সকাল-সন্ধ্যায় লেবুর রসের সঙ্গে এক টেবিল চামুচ কালোজিরা তেল পান করুণ আর কালোজিরার নস্যি গ্রহণ করতে পারেন৷

স্ত্রীরোগ সারাতে কালোজিরা

প্রসব ও ভ্রুণ সংরক্ষণে কালোজিরা, মৌরী ও মধু দৈনিক ৪ বার খান। এতে উপকার পাবেন।

সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কালোজিরা

সৌন্দর্য বৃদ্ধি বলতে বিষয়টা এমন নয় যে কালো মানুষ ফর্সা হয়ে যাবে৷ মুখের রং যেমনই থাকুক সৌন্দর্য মানে মুখে লাবণ্য থাকা৷ কালোজিরা মুখে লাবণ্যতা আনতে সহায়তা  করে। অলিভ অয়েল ও কালোজিরা তেল মিশিয়ে মুখে মাখুন । তারপর এক ঘণ্টা সময় রেখে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলন।

বাতের ব্যথা উপশমে কালোজিরা

পিঠে সহ অন্যান্য বাতের বেদনা হয় এমন জায়গায় কালোজিরার তেল মালিশ করুন। এ ছাড়া মধুসহ প্রতিদিন সকালে কালোজিরা সেবনে স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

দাঁত শক্ত করে কালোজিরা

দই ও কালোজিরার মিশ্রণ প্রতিদিন দাঁতে ব্যবহার করুন। এতে দাঁতের শিরশির অনুভূতি ও রক্তপাত বন্ধ হবে।

ওজন কমায় কালোজিরা

অতিরিক্ত ওজন সমস্যার কারণ৷  ওজন কমাতে চাইলে খাদ্য তালিকায় উষ্ণ পানি, মধু ও লেবুর রসের মিশ্রণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখন এই মিশ্রণে কিছু কালোজিরা পাউডার ছিটিয়ে দিন। পান করে দারুণ উপকার পাবেন।

তাছাড়া এটি নিয়মিত রান্নায় ব্যবহার করতে পারেন। আরও ভাল প্রভাবের জন্য পানি দিয়ে সেদ্ধ করে পান করুন। পারলে প্রতিদিন সকালে কাঁচা চিবিয়ে খান।

কালোজিরা ব্যবহারে  সতর্কতা

সবকিছুরই একটা নিয়ম থাকে। নিয়মের বাইরে গেলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে৷ কালোজিরার বেলাতেও বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। কালিজিরা নিয়মিত ও পরিমিত খেতে হয়। অতিরিক্ত খুব বেশি খেলে বা ব্যবহার করলে হিতের বিপরীত হয়।

কালোজিরার তেল গর্ভাবস্থায় গ্রহণ করা যাবে না। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত কালিজিরা খেলে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে। কালিজিরা গ্রহণ করার সবটাই করতে হবে পরিমিত পর্যায়ে।

অনেকেই কালিজিরা হজম করতে পারেন না। তবে আস্তে আস্তে অভ্যাস করলে ভালো। যারা সহজে কালিজিরা হজম করতে পারেন না তারা খাবেন না, যারা পারেন তারাই নিয়মিত পরিমিত খাবেন।

গর্ভাবস্থায় ও দুই বছরের কম বয়সের বাচ্চাদের কালিজিরার তেল সেবন করানো উচিত নয়। নকল বা কৃত্রিম কালিজিরার তেল কখনও খাওয়া ঠিক না।

জেনে শুনে বুঝে নিশ্চিত হয়ে কালিজিরা বা কালিজিরার তেল সরাসরি বা প্রক্রিয়াজাত করে খেতে হবে। পুরনো কালিজিরা তেল স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক।

পরিশেষে

পরিশেষে বলা যায়, মুহাম্মদ স. এর বাণি, “কালোজিরা মৃত্যু ব্যাতিত সকল রোগের ওষুধ”, কথাটির যথার্থতা আছে। তবে আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে কালোজিরার পরিমিত ব্যবহারই পারে আমাদেরকে এই সুফল দিতে। সুস্থ থাকুন, ঘরে থাকুন।

Previous articleঅনলাইন থেকে আয় করার জনপ্রিয় ৫ টি উপায়
Next articleষ্টুডিও জিবলী নিয়ে যত কথা
আমি মোঃ হাবিবুর রহমান রাসেল৷ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ অধ্যয়নরত। বই পড়তে ভালোবাসি। বইয়ের গ্রুপ গুলোতে মাঝে মাঝে রিভিউ লিখি৷ যা পড়ি, তা সবাইকে জানাতে ইচ্ছে করে। সেই আগ্রহ থেকেই টুকটাক লেখার চেষ্টা করি।