হারপার লী

 

বই মানুষের জীবন বদলে দেয়- কথাটি সবাই জানি। কিন্তু কোন বই এবং কিভাবে জীবনকে বদলে দেয় তা নেহাতই ব্যক্তিনির্ভর।  ব্যক্তিগতজীবনে আমি নিজেকে পাঠক হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।  এবং আমার এই পাঠকসত্তায় রূপকথার সোনার কাঠি রুপোর কাঠির মতো জীয়নকাঠি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে বই “To kill a mockingbird”.  যার জন্য লেখিকা হারপার লী পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত হয়। লেখিকার জীবন খুব ইন্টারেস্টিং। ১৯৬০ সালে তিনি তার প্রথম বই প্রকাশ করেন।  আর এক বইতে বাজিমাত করা যাকে বলে ঠিক তেমনটাই হয়েছে তার ক্ষেত্রে।

To Kill A Mockingbird

ব্যাপক সুনাম অর্জনের পাশাপাশি প্রচুর অর্থ সাফল্যও এনে দিয়েছিল বইটি।  তারওপর  এই বইয়ের মুভি এডাপ্টেশন ” To Kill A Mockingbird” (1962)  তিনটি বিজয়ী সহ আটটি ভিন্ন ক্যাটগরিতে অস্কার নমিনেশন পেয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্থায়ীভাবে অসীন করে গেছে।  হ্যালো পাঠক, আমি তিয়াশ,  আজ আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি এই বই ও লেখিকা হারপার লী-কে নিয়ে মজাদার  নয়টি তথ্য।  তবে  আর দেরি কেন,  চলুন শুরু করা যাক।

 

লেখিকা বইটির নাম “Atticus” রাখতে চেয়েছিলেন

বইটিতে লেখিকা হারপার লী নব্য কিশোরদের দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক অসঙ্গতিকে দেখাতে চেয়েছেন।  কিন্তু এই বইয়ের আসল আকর্ষণ ছিল অ্যাটিকাস নামের পঞ্চাশ বছর বয়সী লয়্যার।  গতানুগতিক চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে নিজের সন্তানদের  নিজের মতো করে মানুষ করা পরিকল্পনা ছিল তার।  আগাগোড়া নিছক ভালোমানুষটার বিভিন্ন রুপ আমরা বইতে দেখতে পেয়েছি।  কখনো রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বর্ণবাদের বিরোধীতা করেছেন, কখনো নিজের মেয়েকে শিখিয়েছেন সত্যিকারের মানুষ হতে, কখনো প্রিয়জনকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন আবার পরমুহূর্তেই রুদ্র তেজে হাল ধরেছেন সামাজিক ব্যাধির বিপরীতে।

তাই লেখিকার প্রথম ইচ্ছা ছিল চরিত্রটির নামে বইটার নামকরণ করতে।  কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি এই ভাবনা নাকচ করে দেন।  কারণ তিনি চাননি বইটায় কেবল একটা চরিত্রেই ফোকাস করা হোক,  তিনি চেয়েছেন বইটার ছোট বড় সব দিক সমান প্রাধান্য  পাক। অবশেষে তাই বইটার নামকরণ হয় “To Kill a Mockingbird”।

বইটির অ্যাটিকাস চরিত্রটি লেখিকার বাবা AG Lee এর ছায়ায় গড়া

বইয়ের অ্যাটিকাসের মতো Mr. AG Lee ছিলেন লয়্যার  এবং  ব্যক্তিজীবনে তিনিও একজন  ব্ল্যাক আমেরিকানের হয়ে কেইস লড়েছিলেন, যাকেও খুনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।  এবং বর্ণবাদের জন্য তিনি এই কেইস হেরে যান। ঘটনাটা তরুণ লী-র মনে প্রচুর দাগ কাটে  এবং তিনি সেই ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বইয়ের অনেকটা অংশ লিখেন  এবং তার বিভিন্ন ইন্টারভিউতে হারপার লী এই অনুপ্রেরণার কথা জানিয়েছেন।

বইতে উল্লেখ করা Maycomb শহরটি লেখিকার নিজের হোমটাওনের আদলে গড়া

Alabama র  Monroeville শহরে বেড়ে ওঠেছিলেন লেখিকা।  বই লেখা শুরু করার সময় তাই অনুপ্রেরণা হিসেবে  আশেপাশের ব্যক্তিজীবনকেই ফোকাস করেন তিনি।  বইতে উল্লেখ করা Jem ও scout এর বাড়ি ও তাদের প্রতিবেশীরা সবই লেখিকার ব্যক্তিজীবন থেকে অনুপ্রাণিত।

লেখিকা চাননি পাঠকরা তার নাম ভুল উচ্চারণ করুক তাই তিনি তার নামের প্রথমাংশ বাদ দেন

লেখিকার পুরো নাম Nelle Harper Lee যার প্রথম অংশ Nelle তার দাদীর (Ellen)  নামের উল্টো।  লেখিকা তার নামের এই অংশ একটু ভিন্ন ভাবে উচ্চারণ করতেন।  Nelle কো তিনি  নেলি বা নেইলি-র মতো উচ্চারণ না করে নেল উচ্চারণ করতেন।  তার বন্ধু ও কাছের লোকজনও তাকে নেল বলে ডাকতেন।  বই লেখার সময় তিনি নামের এই অংশ বাদ দেন।  নাম নিয়ে তিনি প্রচুর সংবেদনশীল ছিলেন।  তিনি চাননি তার পাঠকরা তার নাম ভুল উচ্চারণ করুক।

লেখিকা শব্দ চয়নে খুব সময় ব্যয় করতেন এবং খুব ধীর গতিতে লিখতেন

লেখিকা মেথোডিক্যাল লেখায় বিশ্বাসী ছিলেন৷  গল্পের ফ্লো, প্রতিটা শব্দ নিয়ে তিনি বিচার বিবেচনা করে লিখতেন।  তার লেখার গতি ছিল খুব কম।  তিনি দৈনিক ৬ থেকে ১২ ঘণ্টা ব্যয় করতেন পান্ডুলিপির একটা পৃষ্ঠা লেখার জন্য।  তার এই ধীরগতি তার লেখায় এনে দিয়েছে এক গাম্ভীর্যতা।  আর তাই তিনি খুব অল্প লেখা দিয়ে (কেবল দুটি বই, যার একটিকে সিকুয়েল বলে প্রচার করা হলেও যেটি মুলত To kill a mockingbird বইয়ের প্রারম্ভিক ড্রাফট) বিশ্বসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছেন চিরস্থায়ী আসন।

লেখিকা ব্যক্তিগতজীবনে লেখক Truman Capote এর খুব কাছের বন্ধু ছিলেন

লেখক হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার আগে থেকেই লী এবং ট্রুম্যানের বন্ধুত্ব ছিল।  বইতে লী ট্রুম্যানের আদলে Dill নামের এক চরিত্র গড়ে তোলেন।  ডিল গ্রীষ্মের ছুটিতে Maycomb শহরে তার চাচীর বাড়িতে বেড়াতে আসেন এবং সেখানে জেম ও স্কাউটের সাথে তাদের সখ্যতা হয়।  যাহোক লী এবং ট্রুম্যানের সখ্যতা কতটা প্রগাঢ় ছিল তা আন্দাজ করা  যায় লী-র ট্রুম্যানের বই In Cold Blood এর জন্য গবেষণা করতে সাহায্য করায়।

অস্কার বিজয়ী  অভিনেতা Gregory Peck সাথেও বেশ প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল লেখিকার

Gregory Peck তার অভিনয় দক্ষতার জন্য সব সিনেপ্রেমীদের কাছে নন্দিত। কিন্তু তার অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় মাইলফলক ছিল To Kill a Mockingbird মুভির মুখ্য চরিত্র Atticus Finch  চরিত্র। যার জন্য ১৯৬৩ সালে সেরা অভিনেতা হিসেবে অস্কার জিতেন তিনি।  এই মুভির সময় থেকেই লেখিকার সাথে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।  তাদের এই বন্ধুত্ব টিকে ছিল লেখিকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।  শোনা যায় লেখিকা Gregory Peck কে To Kill a Mockingbird মুভিতে অনবদ্য অভিনয় করার জন্য তার বাবার ব্যবহৃত পকেট ঘড়ি উপহার দেন।

লেখিকা সত্য ঘটনা নির্ভর একটি অপরাধ কাহিনী লিখতে চেয়েছিলেন

ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে লেখিকা সামাজিক জীবন ধারা থেকে নিজেকে কিছুটা আড়াল করে রাখেন। তারপর তিনি আর কখনোই কোনো ইন্টারভিউ দেননি।  ২০১৬ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মোটে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন।  তবে শোনা যায় তিনি তৃতীয় আরো একটি বই নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছিলেন।  প্রস্তাবিত Reverend নামের এই সত্য অপরাধ আশ্রয়ী বইটার জন্য লেখিকা ১৯৭৮ সালের দিকে প্রচুর গবেষণা করেন।  কিন্তু অজ্ঞাত কারণবশত লেখিকা বইটা অসমাপ্তই রেখে দেন।

মিলিয়নার হিসেবে পরিগণিত হলেও লেখিকা হারপার লী উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন না, খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি

To Kill A Mockingbird  লিখে লেখিকা রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেছিলেন। (  উল্লেখ্য বইটার ৫০+ সংস্করণ এসেছে শুধু ইংরেজি ভাষায়। বিশ্বজুড়ে বইটির ৭০ মিলিয়নের ওপর কপি বিক্রি হয়েছে। অনুদিত হয়েছে ত্রিশের অধিক ভাষায়।  প্রকাশ হবার ৭০ বছর পরেও প্রতিবছর শুধু অ্যামাজনেই বইটার দশ লাখের ওপর বিক্রি হয়)  ২০১২ সালের এক কোর্ট ডকুমেন্ট অনুযায়ী এই একটা বই থেকেই তিনি প্রতিবছর তিন মিলিয়ন ডলার রয়ালিটি পেতেন।   কিন্তু এতো কিছুর পরেও নিজের বাবার শেখানো জীবনযাত্রায় অটল থেকেছেন তিনি। সারাটানজীবন থেকেছেন আর আট দশটা সাধারণ মানুষের মতো।  তিনি তার বোন Alice এর সাথে একতলা এক রেঞ্চ হাউজে থাকতেন। আধুনিক ইলেক্ট্রনিক জিনিসের প্রতি তার বিমুখতা ছিল বলেও জানা যায়।  জীবনদশায় তিনি সেলফোন, কম্পিউটার,  এয়ার কন্ডিশনার,  ওয়াশিং মেশিন কিছুই ব্যবহার করতেন না৷ একেবারেই সাদামাটা ছিলেন তিনি।

সবমিলিয়ে এই ছিল আজকের আয়োজন আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখিকা Harper Lee  এবং তার বই To Kill A Mockingbird নিয়ে কিছু মজার তথ্য।  আশা করি ভালো লেগেছে।  এ নিয়ে আপনার ভালো লাগা, মন্দ লাগা, অভিযোগ, অনুযোগ সব জানাতে পারেন কমেন্ট বক্সে।  দেখা হবে জলদিই নতুন কোনো বিষয় নিয়ে। ততদিন ভালো থাকুন।  সুস্থ থাকুন!

আরো পড়ুনঃ  বই থেকে সিনেমা হওয়া অসাধারণ ৭টি বই 

Previous articleবই থেকে সিনেমা হওয়া অসাধারণ ৭টি বই
Next articleআমি পিছিয়ে পড়েছি, আপনারা সতর্ক হন, সফলতা সময়ের ব্যাপার
আমার জন্য জীবন মানে বই আর সোশাল মিডিয়া। বইতে বাঁচি, সোশাল মিডিয়তে শ্বাস নিই। দুইয়ের কোনোটিতেই একটু ভাটা পড়লেই মেঘ জমে আমার আকাশে। বৃষ্টিভেজা দিনে বা খর রৌদ্র দুপুরে ছাদের রেলিং এ হাতে বই নিয়ে বা জানালার ধারে একমনে প্রিয় তারকাদের প্রোফাইল ঘাটা, দুটিতেই সমান পারদর্শী। মাঝে মাঝে Indie pop গানের জগতে বা কখনো kpop নিয়ে মাতি। কখনো korean rom-com মুভি দেখে হাসতে হাসতে প্রেমে পড়ি, কখনো Titanic দেখে বিশাদরসে হাবুডুবু খাই। জীবন এভাবে চলছে। মন্দ কি?