একই সাথে বই পড়ুয়া এবং সিনেমা ভক্ত ব্যক্তির অভাব নেই জগতে, বই থেকে হওয়া সিনেমা যেন পড়ুয়াদের কাছে একটি উত্তেজনার নাম! কোনো বই পড়ে ভালো লাগলেই ইন্টারনেট ঘেঁটে তার সিনেমা এডাপ্টেশন খুঁজে বের করা এবং সেটা দেখে বইয়ের দৃশ্যগুলো চোখের সামনে নতুনভাবে ফুটিয়ে তোলার আলাদা মজা রয়েছে৷ ঠিক তেমনি কোনো সিনেমা এডাপ্টেশন দেখে হতাশ হওয়াটাও বেশ সাধারণ ঘটনা। তাই আজ আমার নিজের দেখা সেরা কিছু “বই থেকে সিনেমা” নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি আমি উম্মে শারিকা।
হরর মুভি নিয়ে আমার আরেকটি লেখা পড়ুনঃ হরর সিনেমা জগতের ছয়টি রত্ন
The Godfather (Author : Mario Puzo), Director : Francis Ford Coppola

বিশ্বের সেরা ক্লাসিক সিনেমার একটি হিসেবে “দ্য গডফাদার” এর নাম শোনেন নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। মাফিয়া জগতের শক্তিশালী এবং সম্ভ্রান্ত কর্লিওনি পরিবারকে ঘিরে যে জগত তৈরি করেছিলেন মারিও পুজো তার উপন্যাসে, সেটিরই জীবন্ত চিত্র তুলে ধরেছেন ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা তার কালজয়ী সিনেমাতে। মারলন ব্র্যান্ডোকে তার নিজের নামের চেয়েও ভিটো কর্লিওনি নামে পরিচিত করানোই যেন সহজ, এতোটাই ঢুকে গিয়েছিলেন তিনি সেই চরিত্রের ভেতর! আরেক কিংবদন্তী আল পাচিনোর দৃপ্ত পদচারণাও এই সিনেমার স্মরণীয় দিক হিসেবে সবসময় স্মৃতিতে থাকবে। গডফাদার সিনেমার রয়েছে তিনটি পার্ট – যদিও বা প্রথমটি সহজেই ছাড়িয়ে গিয়েছে পরের দু’টোকে, কিন্তু সম্পূর্ণ ট্রিলজি দেখে নেয়া ভালো। প্রথম সিনেমাটি তার সফলতার ছাপ রেখেছিল একাডেমি এওয়ার্ডসে এগারোটি ক্যাটাগরিতে মনোনীত হয়ে।
Breakfast At Tiffany’s (Author : Truman Capote), Director : Blake Edwars

“ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানি’স” ক্লাসিক Genre-এর পাঠকদের কাছে এক ভালোবাসার নাম। হঠাৎ পরিচয়ে গড়ে ওঠা এক চমৎকার বন্ধুত্ব আর অপ্রকাশিত অনুভূতির গল্প এটি। ছোট্ট বইটি শেষ করবার পর মনে হয়, ইশ এটা যদি আরো খানিকটা সময় ধরে পড়া যেতো! ঠিক তখন মনের চাওয়া মিটিয়ে নিতে কিংবা আরো কিছু সুন্দর সময় পার করতে দেখে নিতে পারেন সিনেমাটি। বই পড়ার সময় প্রধান চরিত্র হলি গোলাইটলিকে মনে মনে হয়তো কল্পনা করতে পারেন অনেক ভাবে, অনেক বেশে! কিন্তু সিনেমা দেখতে বসে মনে হবে এই চরিত্র তৈরি হয়েছে অড্রে হেপবার্ন এর জন্যে! চঞ্চলা হরিণীর মতো স্বভাবের চরিত্রটি – যে ছিল কিছুটা খামখেয়ালি, আর অনিন্দ্যসুন্দরী – যার কাউকে আপন করে নিতে একটুও সময় লাগতো না, সেই হলি হিসেবে নিখুঁত ছিলেন গোল্ডেন এইজ হলিউডের হার্টথ্রব নায়িকা অড্রে। একাডেমি এওয়ার্ডস নমিনেশনে পাঁচটির একটি গিয়েছিল তার হাতে – সেরা অভিনেত্রী হিসেবে। একবার দেখার পর বারবার দেখতে ইচ্ছা হবে এই ভালো-লাগার সিনেমা।
Of Mice & Men (Writer : John Steinbeck), Director : Gary Sinise

দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া উপন্যাস জন স্টাইনবেকের “অফ মাইস অ্যান্ড মেন”। মানসিক প্রতিবন্ধী একজন মানুষ আর তার পথসঙ্গীর সমস্যায় জর্জরিত দিনগুলোতে ডুবে যাবেন আপনি, মনে হবে খুব কাছের কারো কষ্টকর দিনাতিপাত দেখতে পাচ্ছেন। বন্ধুত্ব, মায়া, সহানুভূতি আর অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো সমাপ্তি সবকিছু মিলিয়ে একটা বিষণ্ন আবহ তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু সেটা মিস করার সুযোগ নেই। সেরা সৃষ্টিগুলো সবসময় সুখকর কিছু হয় না, বা সবসময় তারা হাসি-আনন্দ নিয়ে কথা বলে না। দুঃখের ভেতরও থাকে শিল্প, অথবা অসাধারণ কোনো কাহিনী।
To Kill A Mockingbird (Author : Harper Lee), Director : Robert Mulligan

একটি বই দিয়ে পুরো জগত বাজিমাত করে দেয়া এবং পুলিৎজার পুরস্কার জিতে নেয়া লেখিকা হার্পার লী। বর্ণবৈষম্য নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট আরো কিছু কারণে এই বই নিষিদ্ধও হয়েছিল এক সময়ে কিন্তু কিছুই দাবিয়ে রাখতে পারে নি লেখিকার অমর সৃষ্টিকে। বিশ্বজুড়ে চল্লিশটি ভাষায় অনূদিত হওয়া বইটির সিনেমা এডাপ্টেশনও সমপরিমাণে চমৎকৃত করতে সক্ষম দর্শকদের। ইতিহাসের সেরা একটি চরিত্র বলে তর্কাতীতভাবে আখ্যা দেয়া যায় অ্যাটিকাস ফিঞ্চকে। আর তাতে বেশ মানিয়ে গিয়েছিলেন গ্রেগরি পেক। বইয়ের অসাধারণ মুহূর্তগুলো, সবচেয়ে প্রিয় জায়গাগুলো নতুনভাবে ধরা দিচ্ছিলো সিনেমাতে। দেখবার পরে একটা পরিপূর্ণতার অনুভূতি এসে ভর করে মনে। আটটি ক্যাটাগরিতে একাডেমি এওয়ার্ডস নমিনেশন পাওয়া সিনেমাটি জিতে নেয় তিনটি এওয়ার্ড, যার মধ্যে একটি বেস্ট এক্টর বিভাগে পান গ্রেগরি পেক।
The Outsiders (Author : S. E. Hinton), Director : Francis Ford Coppola

ষাটের দশকের আরেকটি স্মরণীয় ক্লাসিক “দ্য আউটসাইডারস”। বন্ধুত্বের বাঁধন যখন হয়ে উঠে পরিবারের বাঁধনের মতো মজবুত, সেটা পড়তে কিংবা দেখতেও যেন শান্তি লাগে! একগুচ্ছ কিশোর এবং তরুণের গল্প এটি। আপনাকে নস্টালজিক করে দেবে হয়তো অকারণেই! ঠিক গল্পের মতো একটি জীবনের বাসনা উঁকি দেবে মনের ভেতর। অভাব-অনটন কিংবা প্রতিদিনকার বিভিন্ন ঝামেলা সত্বেও দিনশেষে যাদের বল হলো শক্ত একটি সম্পর্কের ভিত্তি, অল্প কিছুতে পরিতৃপ্তি খুঁজে নেয় তারা। চরিত্রগুলো আপনার আমার খুব কাছের মানুষদের মত, চলতে ফিরতে ঠিক যেরকমটা দেখি – একদম বাস্তবের মিশেলে তৈরি। এডাপ্টেশনে ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার দুর্দান্ত হাত “দ্য গডফাদার”-এ দেখবার পর এটি শুরু করতে কোনো দ্বিধা লাগে নি। দেখবার পর তার প্রশংসা আরেকবার করতেই হবে। এর সবচেয়ে শক্তিশালী দু’টি দিক হল অভিনয় এবং সিনেমাটোগ্রাফি।
Fight Club (Author : Chuck Palahniuk), Director : David Fincher

তালিকার মধ্যে এই সিনেমাটি একটু অন্যরকম। আমরা যারা বইপাগল তারা সাধারণত বইয়ের নামটা শুনি আগে, পরে খোঁজ নেই সিনেমা এডাপ্টেশনের। কিন্তু ” ফাইট ক্লাব” তার প্রধান খ্যাতি পেয়েছিল সিনেমার উপর ভর করে। অনেকে এটাও বলে থাকেন যে বইয়ের চেয়ে সিনেমার আবেদন বেশি মনে হয়েছে। কিন্তু অতোদূর আমরা না যাই, কেন না সিনেমাটি হয়েছে বইয়ের উপরে তাই প্রধান কৃতিত্ব উদ্ভাবককে দিতেই হবে। তবে সবচেয়ে দক্ষতা আর যত্নের সাথে কোন বইয়ের সিনেমা তৈরি করা হয়েছে তার নাম নিতে গেলে ফাইট ক্লাবের নামটি উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। ডেভিড ফিঞ্চারের অগুণতি ভক্তরা জানেন কি দারুণ সব সিনেমা তার কাছে থেকে আমরা উপহার পেয়ে আসছি, এর মধ্যে তার সিগনেচার ওয়ার্কের একটি ফাইট ক্লাব। অভিনয়ে ব্র্যাড পিট এবং এডওয়ার্ড নর্টন যেন সমানে সমানে পাল্লা দিয়েছেন, রুদ্ধশ্বাস এক অভিজ্ঞতা এই মুভি। বেস্ট সাউন্ড এডিটিং-এ ২০০০ সালে একাডেমি এওয়ার্ডস নমিনেশন পায় এটি। এই ফিল্মের পথ ধরে একই বিষয়বস্তু ঘিরে একের পর এক বহু সিনেমা তৈরি হয়েছে পরবর্তীতে।
(Author : Stephen King), Director : Frank Darabont

এটির গল্প আরো মজার। আইএমডিবিতে প্রথম স্থান দখল করে রাখা এই সিনেমা যে নির্মিত হয়েছে একটি ঔপন্যাসিকা-ভিত্তিক স্ক্রিনপ্লে থেকে, তা মনে হয় এখনো প্রচুর মানুষ জানেন না। না জানাটা কিছুটা যৌক্তিকও। কে ভেবেছিল “হরর কিং” বলে সমাদৃত স্টিফেন কিং যিনি বছরকে বছর হাত পাকিয়ে যাচ্ছেন হরর-এর নানান শাখায়, তিনি এমন সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু লিখেছেন একসময়ে! তার ঔপন্যাসিকা “রিটা হেওয়ার্থ অ্যান্ড শশ্যাংক রিডেম্পশান” থেকে তৈরি করা হয়েছে স্ক্রিনপ্লে। একাডেমি এওয়ার্ডসে সাতটি নমিনেশন পাওয়া এই সিনেমা ১৯৯৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত একইভাবে মুগ্ধ করে যাচ্ছে দর্শকদের।
ভালো লাগার একটা বই পড়া যেমন ভীষণ সুন্দর অনুভূতি দেয়, সাথে সাথে চমৎকার সিনেমা এডাপ্টেশনগুলো অনুভূতিটা বাড়িয়ে দেয় আরো বহুগুণ। কিন্তু এডাপ্টেশন দেখতে হবে খোলা মনে, সবসময় এটা ভেবে নিলেও ভুল হবে যে সিনেমা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করবে বইয়ের ঘটনা, হুবহু কপি করবে। সেরকম হলে বরং একঘেয়েমি চলে আসতে পারে। আবার বইয়ের ধারেকাছে পৌঁছে না এরকম সিনেমারও অস্তিত্ব আছে, মেজর অংশ বদলে দিলে সাধারণত যেটা হয়ে থাকে। উপরোক্ত প্রতিটি সিনেমায় পরিচালক যেমন যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছেন প্রধান কাহিনীর প্রতি, সাথে বোনাস হিসেবে রেখেছেন নিজেদের সৃষ্টিশীলতা আর অন্যরকম চিন্তা-ভাবনার ছাপ।
সেজন্য “বইয়ের মতো সুন্দর” কিংবা “বইয়ের চেয়ে সুন্দর” কথাগুলো অন্তত এসব সিনেমার ক্ষেত্রে খাটে না – তার চেয়ে বলা যাক “নিজেদের মতো সুন্দর”। লেখালেখির জগত একটি শিল্প, ঠিক তেমনি সিনেমার জগতও একটি শিল্প। প্রত্যেক শিল্পী তাতে আলাদাভাবে নিজের ছাপ রেখে যান, আর আমরা দর্শকরা সেটা উপভোগ করবার সুযোগ পাই।
এছাড়া যারা আমাদের ব্লগ থেকে লেখা পাবলিশ করে ব্যাক-লিংক নিতে আগ্রহী তাদের জন্যেও রয়েছে আকর্ষণীয় অফারঃ




লাস্ট প্যারাটা দুর্দান্ত ছিল আপু। অযথা কমপারিজনে যাওয়ার কিছু নেই। প্রতিটা জিনিস তার নিজ জায়গায় সুন্দর! ❤