সূর্যগ্রহণ কেন হয় এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি?

সূর্যগ্রহণ কেন হয় এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি?

মহাকাশের কোন বস্তু দেখার সময় যদি তা অপর কোন বস্তুর আড়ালে চলে যায় তাহলে তাকে গ্রহণ বলা হয়। আমরা সচরাচর সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণের নাম শুনি। মহাকাশে এই দুইটির বাইরেও আরও অসংখ্য গ্রহণ হয়ে থাক যা আমাদের আগোচরেই রয়ে যায়। এর আগে আরেকটি ব্লগে আমি চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি আপনাদের ভাল লেগেছে, আজকের ব্লগে আমি আলোচনা করব সূর্যগ্রহণ কি, সূর্যগ্রহণ কেন হয় এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়ে। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে।

সূর্যগ্রহণ কি এবং সূর্যগ্রহণ কেন হয়

প্রথমেই বলেছি মহাকাশের কোন বস্তু দেখার সময় যদি তা অন্য কোন বস্তুর আড়ালে চলে যায় তাহলে সেই ঘটনাকে গ্রহণ বলা হয়। যেহেতু ব্যাপারটি সূর্যগ্রহণ তাই বুঝতেই পারছেন সূর্য অন্য কোন বস্তুর মাধ্যমে আমাদের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে বলেই এর নাম সূর্যগ্রহণ। গ্রহণ একটি বর্ণিল মহাজাগতিক ঘটনা। তাই মানুষের মাঝে সূর্যগ্রহণকে ঘিরে রয়েছে অনেক উচ্ছাস।

এই ঘটনা ঘটার জন্য তিনটি বস্তু লাগবে। একটি হল যেখান থেকে আমরা দেখব, আরেকটি বস্তু হল সূর্য এবং তৃতীয় বস্তুটি এমন একটি বস্তু যা কিনা আমাদেরকে সূর্য থেকে আড়াল করে ফেলবে। তাহলেই সূর্যগ্রহণের ঘটনা ঘটবে।

পৃথিবী থেকে প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে যে বস্তুটি সূর্যকে আমাদের থেকে আড়াল করে ফেলে তা হল চাঁদ। চাঁদ যখনই সূর্য এবং পৃথিবীর মাঝ বরাবর আসে তখনই সূর্য গ্রহণ ঘটে। আশা করি, সূর্যগ্রহণ কেন হয় আপনার কাছে এখন একদমই পানির মতই পরিস্কার।

সৌরজগৎ নিয়ে কন্সেপ্ট

আগে সৌরজগৎ নিয়ে বেসিক কিছু ব্যাপার জেনে নেয়া দরকার। তা নাহলে সূর্যগ্রহণ ব্যাপারটি পুরাপুরি মাথায় ঢুকবেনা। আমাদের এই সৌরজগতে পৃথিবী তার নিজস্ব কক্ষপথে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে এবং একই সাথে নিজ অক্ষের উপর লাটিমের মত ঘুরছে। একই ভাবে চাঁদ তার কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিন করছে এবং নিজ অক্ষের উপর লাটিমের মত ঘুরছে।

সূর্যগ্রহণ কিভাবে সংগঠিত হয়

এভাবে ঘুরতে ঘুরতে এমন কিছু সময় আসে যখন চাঁদ, পৃথিবী এবং সূর্য একই লাইন বরাবর থাকে এবং চাঁদের অবস্থান পৃথিবী ও সূর্যের মাঝামাঝি হয়ে যায়, তখনই আমরা পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু স্থান থেকে আমরা সূর্যকে দেখতে পাইনা চাঁদের ছায়ার কারনে এবং সূর্যগ্রহণ সংগঠিত হয়। নিচের ছবি দেখলে ব্যাপারটি পানির মত পরিস্কার হয়ে যাবে আশা করি।

সূর্যগ্রহণ

উপরের ছবি থেকে সূর্যগ্রহণ বিষয়টি আশাকরি পরিস্কার বুঝতে পেরেছেন। দেখা যাচ্ছে, সূর্য, চাঁদ আর পৃথিবী একই সরল রেখায় অবস্থান করছে।  চাঁদের অবস্থানের কারনে পৃথিবীর একটি অবস্থান থেকে সূর্যকে দেখা যাচ্ছেনা। এওই ঘটনাই সূর্যগ্রহণ।

সূর্যগ্রহণ মোট তিন রকমের হতে পারে। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, খন্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ এবং বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। এই প্রকারগুলো  নির্ভর করে চাঁদ সূর্যকে কতটা ঢেকে ফেলছে তার ওপর।

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ কি

সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ তখনই ঘটে যখন সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদ এমন অবস্থানে চলে আসে যাতে চাঁদ সূর্যের আলোকে একদম সম্পূর্ণভাবে ঢেকে দেয়। এমন সময়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এমনকি কয়েক মিনিটের জন্য আকাশ রাতের আকাশের মত অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়।

সূর্য চাঁদের তুলনায় ৪০০ গুণ বড় এবং চাঁদ পৃথিবী থেকে যত দূরে, সূর্য তার চেয়ে আরও ৪০০ গুণ বেশি দূরত্বে অবস্থিত। একারনেই কোন নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণরূপে ঢেকে দিতে সক্ষম হয়।

আমরা ভেবে থাকি সূর্যগ্রহণ একটি বিরল ঘটনা, আসলে মোটেই তা নয়। প্রতি ১৮ মাস পরপর সূর্যগ্রহণ ঘটে থাকে। তবে বিরল ঘটনা হল একই অবস্থান থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ এর ঘটনা দেখতে পাওয়া। এমন ঘটনা ঘটে প্রায় ৩৭৫ বছর পরপর।

খন্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ কি

চাঁদ যখন সূর্যকে আংশিকভাবে ঢেকে দেয় তেমন ঘটনাকে আংশিক সূর্যগ্রহণ বা খন্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ বলে থাকে। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার অবস্থান থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা থেকে খন্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়।

উপরের ছবিতে যে হালকা অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা দেখা যাচ্ছে এখান থেকে খন্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ অবলোকন করা যায়।

বিভিন্ন প্রকার সূর্যগ্রহণ

বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ কি

চাঁদ যখন পৃথিবী থেকে অনেক দূরে থাকে, চাঁদের আকৃতি ছোট হবার কারনে সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারেনা। তখন চাঁদ সূর্যের মাঝামাঝি অংশকে ঢেকে ফেলে এবং সূর্যের বাইরের দিকটা আলোর রিং বা আংটির  মত উজ্জ্বল দেখায়। মাঝখানে অন্ধকার এবং চারদিকে আলোর বলয়। এমন ঘটনাকে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ বলে।

বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ সাধারণত সবচেয়ে বেশি সময় ধরে হয়ে থাকে। কখনও কখনও এটি ১০ মিনিট সময়কালও হতে পারে।

সূর্যগ্রহণ নিয়ে যত কুসংস্কার

আমাদের দেশ সহ সারা পৃথিবীতে সূর্যগ্রহণ নিয়ে নানা কুসংস্কার প্রচলিত আছে। নিচে এর কিছু উল্লেখ করা হলঃ

  • সূর্যগ্রহণ চলাকালে কাঁচা খাবার, ফল ও শাকসবজি খেতে বারন করা হয়। এ সময় নাকি সূর্য থেকে নির্গত রশ্মি খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দিতে পারে, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
  • মাংসজাতীয় খাবার খেতে বারন করা হয়। কারণ সূর্যগ্রহণ এর সময় হজম হতে দেরি হয়। এটিও ভিত্তিহীন কথা।
  • সূর্যগ্রহণের আগে খাবার রান্না করে না রাখাই ভাল বলা হয় যা আসলেই ভিত্তিহীন।
  • অনেকের মতে সূর্যগ্রহণের পরপর গোসল করে নেয়া উচিত।
  • সূর্যগ্রহণ চলাকালে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন অনেকেই।
  • সূর্যগ্রহণ চলাকালে ছুরি- কাঁচির ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলেন অনেকেই।
  • খাবারে হলুদ ব্যবহার করতে মানা করে থাকেন সূর্যগ্রহণ চলাকালে।
  • অনেকের ধারণা সূর্যগ্রহণ চলাকালে সময় সূর্যগ্রহণ দেখলে অন্তঃসত্তা মহিলাদের ক্ষতি হয়ে থাকে। যা ভুল ধারণনা। তবে খালি চোখে সূর্যগ্রহণ দেখা উচিত নয়।
  • অনেকেই সূর্যগ্রহণ চলাকালিন সময় খাওয়া বা পান করা থেকে বিরত থাকতে বলেন যা ভিত্তিহীন।

ইসলাম ধর্মীয় দৃষ্টিতে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ

প্রতিনিয়ত মহান আল্লাহর অস্তিত্বের জানান দিতে থাকা দুইটি বিশাল সৃষ্টি হল চন্দ্র ও সূর্য। জাহেলি যুগেও সূর্য ও সূর্যগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন রকম ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত ছিল। চন্দ্রগ্রহণ কিংবা সূর্যগ্রহণ হলে তখনকার মানুষ মনে করত, অচিরেই দুর্যোগ-দুর্ভিক্ষ ধেয়ে আসবে পৃথিবীর বুকে। আগের দিনের মানুষ চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণকে পৃথিবীতে কোনো মহাপুরুষের জন্ম বা মৃত্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত মনে করত। প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) সেগুলোকে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

আমাদের পবিত্র কোরআনে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে সূর্য ও চন্দ্র। পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে,

هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاءً وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ ۚ مَا خَلَقَ اللَّهُ ذَٰلِكَ إِلَّا بِالْحَقِّ ۚ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

তিনিই আল্লাহ, যিনি সূর্যকে রশ্মিময় ও চন্দ্রকে জ্যোতিপূর্ণ করেছেন এবং তাঁর ( পরিভ্রমণের ) জন্য বিভিন্ন মনযিল ’ নির্ধারণ করেছেন, যাতে তােমরা বছরের গণনা ও ( মাসসমূহের ) হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এসব যথার্থ উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে সৃষ্টি করেননি। যে সকল লােক জ্ঞান – বুদ্ধি রাখে, তাদের জন্য তিনি এসব নিদর্শন সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,

وَّ جَعَلۡنَا سِرَاجًا وَّهَّاجًا

‘আর আমি সৃষ্টি করেছি একটি প্রজ্বলিত বাতি। ’ (সুরা নাবা : ১৩)

প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) গ্রহন নিয়ে সকল কুসংস্কারকে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মুগিরা ইবনু শুবা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুত্র ইবরাহিমের ইন্তিকালের দিনটিতেই সূর্যগ্রহণ হলে আমরা বলাবলি করছিলাম যে নবীপুত্রের মৃত্যুর কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে।

এসব কথা শুনে নবীজি (সা.) বললেন,

‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহ তাআলার অগণিত নিদর্শনের দুটি। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ হয় না। ’ (সহিহ বুখারি : ১০৪৩)

চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণকে আল্লাহ তাআলার কুদরত হিসেবে অভিহিত করে অন্য হদিসে নবীজি (সা.) সাহাবিদের চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণের সময় নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,

‘কোনো লোকের মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তবে তা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনগুলোর দুটি। তোমরা সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হতে দেখলে নামাজে দাঁড়িয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি : ৯৮৪)

আশা করি সূর্যগ্রহণ কি, সূর্যগ্রহণ কেন হয় এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি তা আপনারা সবাই বুঝতে পেরেছেন। সব্বাইকে ধন্যবাদ। আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটিকে সবস্ক্রাইব করে নিতে ভুলবেন না।


Leave a Reply