সাহিত্য এবং সিনেমায় গথিক হরর

সাহিত্য এবং সিনেমায় গথিক হরর

গথিক হরর এর নাম অনেকেই শুনে থাকবেন – বিশেষত যারা রয়েছেন ভৌতিক সিনেমা ও বইয়ের ভক্ত। বছরের এই সময়টা – অর্থাৎ অক্টোবর নভেম্বরের শুরু মানেই হেমন্তের ছোঁয়া, আসছে শীতের পূর্বাভাস। আর তার উপর চলছে আইসোলেশন। এই পরিবেশে ইচ্ছে করে চট করে বসে পড়ি ভৌতিক সিনেমা কিংবা বই নিয়ে, চলে যাই রোমাঞ্চের জগতে – কিছুক্ষণের জন্য ধারণ করি অন্যরকম এক অনুভূতি। আর তার জন্য গথিকের চেয়ে উত্তম কিছু হয় না।

গথিক হরর ব্যাপারটা আসলে কি?

এই ঘরানার লেখার প্রেক্ষাপট শুনতে বেশ সহজ-সরল। এখানে বেশিরভাগ সময়ে প্রেক্ষাপট হিসেবে থাকে পুরোনো কোনো রাজবাড়ি, প্রাসাদ, মানসিক হাসপাতাল, অব্যবহৃত পুরানো গির্জা ইত্যাদি চিত্র। কিন্তু যেটা বিশেষত্ব দিয়েছে এই ঘরানাকে তা হলো এতে লেখাগুলো হয় অনেকটা সাইকোলজি-নির্ভর।

মানব-মনের তীব্রতম আতঙ্ক, ভীতি, কিংবা যে জিনিসগুলো সহজে উঠে আসে না প্রচলিত সাহিত্যে এতে লেখা হয় তাই নিয়েই। উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করি মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে, যুগে যুগে যেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে বলা হয়েছে দানব – সে ছিল এক পরিস্থিতির শিকার একাকী চরিত্র, যার বাইরের চেহারা দেখে তাকে দানব বানিয়ে দিয়েছিলো মানুষ। এখানে খল চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল স্বয়ং মানুষকেই। এটি কেবল একটি উদাহরণ, আরো বহু ভিন্নধর্মী লেখা ও দৃশ্য চোখে পড়বে একবার যখন ডুবে যাবেন গথিকের জগতে।

গথিক শব্দটির বিস্তার অনেক বিশাল। সাহিত্য, সঙ্গীত, ফিল্ম-টিভি সিরিজসহ বহু জায়গায় এর গভীর প্রভাব দেখা গিয়েছে অনেককাল আগে থেকে। তবে আজ কথা বলবো এ ঘরানার সাহিত্য আর সিনেমাকে কেন্দ্র করেই।

গথিক এর উৎপত্তি কিভাবে

সাহিত্যে হররের অন্যতম পাঠকপ্রিয় একটি শাখা গথিক। এর উৎপত্তি হয়েছিলো ইংলিশ লেখক হোরেস ওয়ালপোলের হাত ধরে। আর তার কাহিনীও বেশ মজার। ১৭৬৪ সালে ওয়ালপোলের একটি বই প্রকাশিত হয় – যার নাম ছিল “The Castle Of Otantro – A Story“। প্রথমে ওয়ালপোল দাবী করেছিলেন এই বইটি আসলে তার নিজের লেখা নয়, ষোড়শ শতকের একজন ইতালিয়ান ঔপন্যাসিক ওনুফ্রিও মুরালতো-র লিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে তিনি এটি অনুবাদ করেছেন। এবং মুরালতো-র পাণ্ডুলিপিতে যে কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তাও আরো বহু বছর আগের গল্প – সম্ভবত ক্রুসেডের সময়কার। কিন্তু পরবর্তীতে ওয়ালপোল নিজ দায়িত্বে স্বীকার করেন যে মুরালতো নামে লেখকের অস্তিত্ব কিংবা ইতালিয়ান পাণ্ডুলিপি সবটাই তার কল্পনাপ্রসূত। তিনি নিজে মধ্যযুগীয় সময়কাল নিয়ে ছিলেন অত্যন্ত উৎসাহী, তাই সেই সময়কার চিত্র – সেই সময়ের আদলে একটি ভৌতিক কল্পকাহিনী ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন লেখায়। তার স্ব-পরিবেশে বইটি পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হবে কি না তা নিয়ে হয়তো তিনি সন্দিহান ছিলেন, তাই বুনেছিলেন ইতালিয়ান লেখকের কাহিনী। তবে তার উদ্দেশ্য বেশ ভালো সাফল্য অর্জন করেছিলো বলা চলে। প্রচুর মানুষ তার বই কিনেছিলো ও পড়েছিলো, পাঠকের উপর বইয়ের প্রভাবও পড়েছিলো গভীরভাবে। আর আজকের সময়ে এসে ওয়ালপোলকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। তার এই বইটি থেকে যে সাহিত্যশাখার সূচনা হয়, তা বছরের পর বছর ধরে উন্নত হয়েছে আরো, উন্মুক্ত করে দিয়েছে নতুন একটি ক্ষেত্র।

পরবর্তী সময়ে গথিক হরর

ওয়ালপোলের দেখিয়ে দিয়ে যাওয়া রাস্তা ধরেই রচিত হয় কিংবদন্তীসম কিছু উপন্যাস। ক্রমে ক্রমে বাড়তে থাকে গথিক ঘরানার খ্যাতি – বিস্তার পায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লেখালেখিতে, যুক্ত হয় নতুন উপাদান কিংবা আবহ। সাধারণ যে হরর আমরা দেখে থাকি তার সাথে গথিকের পার্থক্য এই আবহতেই। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে একটি আতঙ্কের আবেশ গড়ে তোলা আর পুরোটা সময় পাঠককে ধরে রাখার জন্য যেন ভৌতিক আর শৈল্পিক দু’টো বিষয়ের সমন্বয় গড়ে তুলেছিলেন তারা। ভিক্টরিয়ান যুগে এসে – অর্থাৎ উনবিংশ শতকে এই ঘরানার হয় নতুনভাবে বিবর্তন। বোদ্ধাসমাজে কিছুটা কমে গিয়েছিল গথিকের আবেদন, কিন্তু ঠিক সেই সময়টাতেই অসাধারণ কিছু লেখা উপহার দেন এডগার এলান পো-র মত লেখকেরা।

শুধুমাত্র অতিপ্রাকৃত জিনিসের দিকে নজর দেয়া বাদ দিয়ে এডগার এলান পো কাজ করেছিলেন চরিত্রের মনস্তত্ব ও উন্মাদনা নিয়ে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাজের একটি হলো “দ্য ফল অফ দ্য হাউজ অফ আশার”। গথিক ঘরানার পথিকৃৎদের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে থেমে থাকেন নি, গথিককে আবিষ্কার করেছেন নতুনভাবে। উনবিংশ শতকের আরেকটি গথিক উপন্যাস “ওয়াদারিং হাইটস”-এর নাম ক্লাসিক হিসেবে শোনা যায় জগতের সকল প্রান্তের পাঠকদের মুখে মুখে। অথচ যখন প্রকাশিত হয়েছিল ওয়াদারিং হাইটস, নেতিবাচক মন্তব্যের মুখোমুখিই হতে হয়েছিল উপন্যাসটিকে সেই সময়ে। প্রতিভাধর লেখকেরা এগিয়ে থাকেন সময়ের চেয়ে, তাদের দৃষ্টীভঙ্গী চলমান সমাজে সবসময় সঠিকভাবে গ্রহণ করা হয় না। কিন্তু পরবর্তীতে ঠিকই সাদরে গৃহীত হয় সেটা – ব্যাপারটা কিছুটা দুঃখজনক হলেও আমরা পাঠক হিসেবে এটুকু ভেবে তৃপ্তি লাভ করতে পারি যে সেই মূল্যবান লেখাগুলো আমরা এত বছর পর এসে পড়বার সুযোগ পাচ্ছি।

ফিরে আসি আগের কথায় – “Little Women” উপন্যাসের লেখিকা লুইযা মে অলকটকে সকলে চিনে এসেছে তার এই লেখাটির জন্যই। ছদ্মনামে এই মানুষটির কিন্তু রয়েছে ব্যক্তিক্রমধর্মী কিছু লেখাও। তার উপন্যাস “A Long Fatal Love Chase” নারীকেন্দ্রিক একটি গথিক সাসপেন্স। যেসব লেখককে প্রভাবিত করেছিল এই ঘরানা তার মধ্যে আরেকজন হলেন চার্লস ডিকেন্স। যিনি তার লেখায় সময়কাল আধুনিক ধরে নিলেও চেষ্টা করতেন চরিত্র, কাহিনী ও পরিবেশের মধ্যে সেই প্রাচীন ভাবটি ফুটিয়ে তোলার জন্য – কিংবা দুঃখ-বেদনা ও হারানোর শোক। এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত উদাহরণ হলো “অলিভার টুইস্ট”, “গ্রেট এক্সপেকটেশান্স”। মেরি শেলীর কালজয়ী উপন্যাস “ফ্রাঙ্কেনস্টাইন”, রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের “দ্য স্ট্রেঞ্জ কেইস অফ ডক্টর জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড”, ব্রাম স্টোকারের “ড্রাকুলা”, অস্কার ওয়াইল্ডের “দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে”, হেনরি জেমস এর “দ্য টার্ন অফ দ্য স্ক্রু” প্রতিটি গথিক রচিত হয়েছে উনবিংশ শতকে। যেগুলো আমাদের কাছে এতটাই পরিচিত নাম যে প্রতিটি পাঠক তার পাঠকজীবনে এর অন্তত কয়েকটি ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছেন। অন্যান্য লেখকের কাজে, থিয়েটার-ড্রামা-সিনেমা জগতে বারংবার উঠে এসেছে এই চরিত্র ও লেখাগুলোর রেফারেন্স।

গথিকের সাথে প্রেমের সংযোগটা ছিল সূচনা থেকেই। সেটি নতুনভাবে আবার উঠে আসে ড্যাফনে দু মরিয়ের লেখা উপন্যাস “রেবেকা”-তে, যেটি প্রকাশ হয়েছিল ১৯৩৮ সালে এবং পাঁচবার এর উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে সিনেমা। বলা হয় রেবেকা উপন্যাসটির পেছনে কিছুটা উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছিল শার্লট ব্রন্টির লেখা “জেন আয়ার”। এই ঘরানাটি উৎপত্তি থেকেই ছড়িয়েছে বৃক্ষের মত। প্রত্যেক লেখকই ফিরে ফিরে যেতেন পেছনের দিকে, কিন্তু কখনো পুরোপুরি পুরানোর ছায়ায় থেকে যেতেন না। বিংশ শতকের আরেকজন লেখিকা শার্লি জ্যাকসন। তার “হন্টিং অফ হিল হাউস” চমৎকার একটি লেখা যা থেকে তৈরি হয়েছে দু’টি সিনেমা আর ২০১৮ সালে একটি টিভি সিরিজ যেটি পুরোপুরি বইয়ের গল্প নয়, কিন্তু প্রেক্ষাপট একই ধরণের। বিংশ শতক থেকে খ্যাতি না কমলেও কমে এসেছে এই ঘরানার নতুন প্রকাশিত বই। বর্তমান সময়ে রচিত গথিক খুঁজতে গেলে আগেকার মত বিপুল হারে লেখা পাবেন না, তবে ভালো কিছু বই হয় নি তা নয়, সবচেয়ে সাম্প্রতিক বলতে গেলে আসবে স্টেফানি মায়ারের লেখা “টোয়াইলাইট” সিরিজের কথা। তবে এই লেখাগুলোতে পুরানো সেই Atmospheric Horror জিনিসটি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

কিছু বিখ্যাত গথিক হরর সিনেমা

ইদানীংকালে গথিকের কিছুটা আগ্রহ মেটাচ্ছে সিনেমা ও টিভি সিরিজ। গত শতকে এবং এখনো করা হচ্ছে এই ঘরানাভিত্তিক কাজ। ষাটের দশকের একটি টিভি সিরিজ “Dark Shadows” তৈরি করা হয়েছিল মূলত গথিকেরই কিছু উপাদান নিয়ে। মায়ানেকড়ে, জাদুবিদ্যা, রক্তচোষা, গথিক ম্যানসন(পুরানো প্রাসাদবাড়ি) অনেক কিছুর মিশেল ঘটানো হয়েছে এতে। এই শতকের কাজের মধ্যে বলতেই হবে “-American Horror Story“-র কথা। এই টিভি সিরিজটি পুরোপুরিভাবে গথিক নয়, এন্থলজি হবার কারণে এতে প্রতি সিরিজে এসেছে আলাদা গল্প। কিন্তু বেশ কয়েকটি সীজনে কাহিনী অনেকটাই ঝুঁকেছে গথিকের দিকে। সেই প্রাচীন পটভূমি, মানসিক ভারসাম্যহীন চরিত্রের উন্মাদ কাজ-কর্ম, এমন কি পরিবেশেও রয়েছে এতোটা পুরোনো ভাব যে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যেতে হয় এটি তৈরি হয়েছে ২০০০ সালের পরে।

সুইডিশ সিনেমা “Let The Right One In“, হলিউডের “Crimson Peak“, “The Woman In Black” ইত্যাদি গথিকের স্বাদটা বেশ ভালোমতই পূর্ণ করবে। এই বছর পৃথিবীব্যাপী সিনেমা-প্রেমীদের অবাক করে দিয়ে প্রথমবারের মতো যে সাউথ কোরিয়ান সিনেমাটি জিতে নিয়েছিল সেরা ছবি ক্যাটাগরিসহ ছয় ছয়টি অস্কার তাকেও আখ্যা দেয়া হয়েছে গথিক হিসেবে, এবং এই ঘরানাকে বলা হয় “রেভোল্যুশনারি গথিক”। আর গত শতকের সিনেমার মধ্যে রয়েছে “Sleepy Hollow“, “Rosemary’s Baby“, “Dracula“, “Nosferatu“।

তো হাতে সময় থাকলে বসে পড়তে পারেন এগুলোর মধ্যেই যেকোনো বই কিংবা সিনেমা নিয়ে। এই ইন্টারনেটের যুগে সবটাই খুব সহজলভ্য, চাইলেই কিছুক্ষণের জন্য ঘুরে আসতে পারেন মধ্যযুগীয় সেই সময়ে৷ হতাশ হবার কোনো সুযোগ নেই!


Leave a Reply