সাইনফেল্ড (Seinfeld) – টেলিভিশন জগতের অন্যতম সেরা সৃষ্টি

সাইনফেল্ড (Seinfeld) – টেলিভিশন জগতের অন্যতম সেরা সৃষ্টি

টিভি সিরিজ ভক্তরা সীটকম (Sitcom) টার্মটির সাথে পরিচিত আছেন বেশ ভালোভাবেই। তবুও শুরুতে একবার বলে ফেলি তাদের জন্য যারা নিছক আগ্রহের বশে লেখাটি পড়তে বসবেন। সীটকম – হলো সিচুয়েশনাল কমেডির সংক্ষিপ্ত রূপ। নাম থেকেই বুঝতে পারছেন, এই ধরণের সিরিজ মূলত হাস্যরসের উপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়ে থাকে – প্রতিটি এপিসোডে একগুচ্ছ চরিত্রের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কিংবা কোনো কোনো সময় প্রফেশনাল কমেডিয়ানের দ্বারাও বিভিন্ন হাস্যরসাত্মক ঘটনার সূচনা করা হয়।

এসব সিরিজের প্রতিটি এপিসোডের দৈর্ঘ্য অন্যান্য টিভি সিরিজের তুলনায় অর্ধেকেরও কম হয়ে থাকে এবং হঠাৎ কখনো মন খারাপের সময়ে একটু হাসিখুশির প্রয়োজনে সীটকম হতে পারে সিরিজ লাভারদের জন্য দারুণ একটি জিনিস।

আরো সুন্দরভাবে বুঝাবার জন্য একটি পরিচিত নাম উল্লেখ করে মূল লেখায় ঢুকি – F.R.I.E.N.D.S. সীটকমটির সাথে পরিচিত নন এমন মানুষ হয়তো বা এখন খুব কমই আছেন। বিশ্বজুড়ে দর্শকদের সীমাহীন ভালোবাসা পেয়েছে এই সীটকম আর এর ছয়টি চরিত্র সবার মনে এখনো চিরতরুণ হয়ে জেগে আছে। এই F.R.I.E.N.D.S এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অনেক সময়ে নাম নেয়া হয় সাইনফেল্ড (Seinfeld)। কিন্তু দু’টি সিরিজেরই ভক্ত এমন লোকেরও অভাব নেই চারিদিকে। ভক্তরা দু’টি সিরিজের হাস্যরসের তুলনা করে থাকেন কৌতুকময় তর্কাতর্কির মাধ্যমেই।

গথিক হরর নিয়ে আমার আরেকটি লেখা পড়ুনঃ সাহিত্য এবং সিনেমায় গথিক হরর।

সাইনফেল্ড (Seinfeld)

চলে আসি সাইনফেল্ড (Seinfeld) এর কথায়। সাইনফেল্ড (Seinfeld) সীটকমটির ঘটনা আবর্তিত হয়েছে প্রধানত চারজন চরিত্রকে ঘিরে – জেরি সাইনফেল্ড, ইলেইন বেনেস, জর্জ কস্ট্যানজা এবং কসমো ক্রেমার। জেরি সাইনফেল্ড বাস্তব জীবনে একজন সুপরিচিত কমেডিয়ান। তার নিজের চরিত্রের খানিকটা কাল্পনিক খানিকটা বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তার এবং তার বন্ধু ল্যারি ডেভিডের সৃষ্ট সিরিজটিতে। আশির দশকে যখন সকলের কাছে কমেডিয়ান হিসেবে দ্রুত পরিচিতি পাচ্ছিলেন জেরি সাইনফেল্ড, তখন তাকে এই সিরিজ তৈরির প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল এবং সেখান থেকেই তিনি আর তার বন্ধু তৈরি করে ফেলেন সাড়াজাগানো এই সীটকম।

সাইনফেল্ড (Seinfeld) কিন্তু সবসময়ে সাড়া-জাগানো ছিল না। ইতিহাসের অনেক উদাহরণের মতই প্রথমদিকে এর আবেদন দর্শক এবং সমালোচকদের কাছে ছিল “কিছুটা হতাশাজনক”। যদিও সমালোচকরা করেছিলেন বেশিই তীক্ষ্ণ বা নেতিবাচক মন্তব্য, সেই তুলনায় অনেকটা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দর্শকদের কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এক্সপেকটেশন এর কোঠা ঠিকঠাক পূরণ করতে না পারায় বোঝা যাচ্ছিলো না এর ভবিষ্যত কি হতে পারে। প্রথম সীজন শেষ করা হয়েছিলো মাত্র পাঁচটি এপিসোডের মধ্য দিয়ে।

যখন সাইনফেল্ড (Seinfeld) প্রথম সীজনটি দ্বিতীয়বার টেলিভিশনে এয়ার করা হয়, তখন এর রেটিং অন্তত সেই পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল যাতে করে বোঝা যাচ্ছিল এর দ্বিতীয় সীজন তৈরি করা হলে দর্শকরা তা আগ্রহ নিয়ে দেখবে। তারও তিন বছর পর সাইনফেল্ড অবশেষে কেড়ে নিতে শুরু করে দর্শকদের নজর এবং টপ ফাইভ সিরিজে জায়গা করে নেয় খুব স্বল্প সময়ে। পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে তৃতীয় সীজন থেকে একলাফে বেড়ে গিয়েছিল সিরিজের রেটিং এবং অষ্টম সীজন পর্যন্ত চলেছে প্রায় একই রকমভাবে। শেষ সীজন অনেক দর্শকের মনঃ পুত হয় নি, সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল আবার কিন্তু সাইনফেল্ড লাভাররা এখনো আগ্রহ নিয়ে শেষ সীজনও দেখে থাকেন। হাজার হোক, খুব দারুণভাবে চলতে থেকে শেষ সীজনে ঝিমিয়ে পড়া সিরিজের সংখ্যা তো কম নয়। সাইনফেল্ডের ক্ষেত্রে সেটা পুরো সীজন না হয়ে বলা চলে শেষের দু’য়েকটি এপিসোডের কারণে ঝিমিয়ে পড়েছিলো।

স্টুডিও জিবলী নিয়ে আমার লেখা পড়ুনঃ স্টুডিও জিবলী নিয়ে যত কথা।

অন্যান্য বেশকিছু সীটকমের নাম সাইনফেল্ড (Seinfeld) এর চেয়ে বিভিন্ন দেশের দর্শকদের কাছে পরিচিত হলেও আমেরিকাতে সাইনফেল্ড পরিচিত “most influential series of all-time” হিসেবে। সাইনফেল্ডের আবেদনটা আসলে কোথায়? সিরিজটির মাধ্যমে মজার বশে কিছু চিন্তা ধারণা দর্শকের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছেন নির্মাতারা। বলা হয় “It is a series about nothing”! সিরিজটি দেখে থাকলে এর অর্থটা সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারবেন। সীটকম ঘরানার কারণে হোক বা যেজন্য হোক – ভারী কিংবা গুরুগম্ভীর বিষয়াদি নিয়ে হয়ে থাকে না, কখনো কখনো কৌতুকের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন গভীর দিক চোখে আঙ্গুল দিয়ে হয়তো দেখানো হয়, সেটাও নগণ্য। কিন্তু যা করা হয় তা হলো খুব কৌশলে একটি ঘটনাপ্রবাহ সাজিয়ে তোলা, সেটাকে অনুসরণ করে পুরো সিরিজ তৈরি করা। সাইনফেল্ডে এই ব্যাপারটি ছিল অন্যরকম। সাইনফেল্ড দর্শকরা সিরিজটিকে ব্যাখ্যা করতে একটি শব্দ বারংবার ব্যবহার করেন, তা হলো “ইউনিক”। সাইনফেল্ড দেখতে বসে একট গৎবাঁধা স্ক্রিপ্ট কিংবা ঘটনার চেয়ে বরঞ্চ আপনার মনে হবে সাধারণ জীবনের কিছু টুকরো ঘটনা দেখছেন।

রক ব্যান্ড কুইন নিয়ে লেখাটি পড়ে দেখুনঃ রক ব্যান্ড কুইন- পঞ্চাশ বছরের সেনশেসন।

প্রতিটি এপিসোডে ঘটনাচক্র আলাদা আলাদা হওয়ার জন্য শুধু নয়, চরিত্রগুলোর কার্যকলাপ আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে স্ক্রিনে যা চলছে তা কারো বাস্তব জীবনের ঘটনাবলি যেটা খানিকটা গুছিয়ে তুলে ধরা হয়েছে আপনার সামনে। তার চেয়ে বড় বিষয়টি হলো চরিত্রগুলোর বাস্তবঘেঁষা আচরণ এবং তাদের মুখ থেকে খুব সহজ একটা ভাব করে তিক্ত সত্যগুলো বের করে আনা। হোক সেটা নিজের ব্যাপারে, পরিবারের বা সমাজের ব্যক্তিবর্গ বা সমাজের আইনকানুন নিয়েও। অনেকবার মনে হতে পারে “আমি নিজে এই কথাটা অনেকবার বলতে চেয়েও বলতে পারি নি” অথবা “এই ব্যাপারটা তো আমি ঠিক এভাবেই চিন্তা করি কিন্তু অন্যদের কাছে স্বীকার করি নি।” সাইনফেল্ড (Seinfeld) এর আরেকটি আকর্ষণীয় দিক আমার কাছে মনে হয় এই জিনিসটা বুঝিয়ে দেয়া যে আমরা সবসময় পর্দায় যে চরিত্রগুলো দেখতে পাই – কেউ পুরোপুরি ভালো, নিষ্পাপ আবার কেউ পুরোপুরি খারাপ সেটা বাস্তবে হতে পারে না। প্রতিটি মানুষ ভালো-খারাপের মিশেলে গড়ে উঠে।

সিরিজটি আপনি যতবারই দেখুন না কেন, প্রতিবার দেখার সময় নতুন একটি – দু’টি দিক চোখে পড়তে থাকবে যা আপনি হয়তো আগের বার মিস করে গিয়েছিলেন এবং চরিত্রগুলোর বিষয়েও খেয়াল করবেন অনেক কিছু। যেকারণে দর্শকদের প্রিয় চরিত্রও বদলাতে থাকে সময়ের সাথে এবং মনে হয় নতুন কোনো সিরিজ দেখছি। এর কমিক ভ্যালু অত্যন্ত উঁচুমানের, এতো ধরণের রেফারেন্স এবং চাতুর্যের সাথে অসংখ্য পরিমাণে কৌতুক কথাবার্তার মাঝে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যার সবগুলো ধরতে পারলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। জেরি সাইনফেল্ড বাস্তব জীবনে কমেডিয়ান হবার কারণে কি না জানা নেই, তার কমেডি শো-এর অংশগুলো ছিল পুরোপুরি ন্যাচারাল। বিভিন্ন সীটকমে যা অনেক সময় দর্শকদের জোর করে হাসানোর চেষ্টা বলে মনে হয়।

পার্শ্বচরিত্রগুলোর প্রত্যেকে আলাদাভাবে দাগ কেটে থেকে যায় মনের ভেতর, যাদের কাউকে সহজে ভুলতে পারবেন না। সিরিজের বিশাল একটি অংশের দৃশ্যপট হিসেবে ছিল জেরি সাইনফেল্ডের নিউইয়র্কের এপার্টমেন্ট। তার প্রতিবেশী চরিত্র কসমো ক্রেমার – বেশিরভাগ সময়ে নিজের এপার্টমেন্ট ছেড়ে তাকে জেরির কাউচে সময় কাটাতে দেখা যায় এবং দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য সে নির্ভর করে থাকে জেরির উপর। এই চরিত্রটি ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে পছন্দের – তার অঙ্গভঙ্গী থেকে শুরু করে কিংবদন্তি পর্যায়ের সব উক্তি, উদ্ভট সব আইডিয়াকে অত্যন্ত স্বাভাবিক কিছুর মতো করে উপস্থাপন করা সব মিলিয়ে সিরিজের রম্য অংশের বিশাল কৃতিত্ব তার।

জর্জ কস্ট্যানজা কমবেশি আমাদের সকলের প্রতিচ্ছবি। কখনো কখনো তার উপর রাগ বা বিরক্তি আসলেও স্বীকার করতে হয় সেসব ছিল প্রকৃতপক্ষে তার দারুণ অভিনয়ের সফল আউটকাম – যেটি প্রশংসার দাবিদার। ইলেইন বেনেস জেরির প্রাক্তন প্রেমিকা, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তারা থেকে যায় বন্ধু হিসেবে। প্রতিটি এপিসোডে তাদের সবার বা অধিকাংশের সাথে বিভিন্ন হাস্যকর ঘটনা ঘটতে থাকে, এপিসোডের শেষে গিয়ে দেখা যায় সে ঘটনা কোনোভাবে একত্রে জড়িয়ে ফেলেছে তাদের চার বন্ধুর সবাইকে। এই অংশটা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে পছন্দের অংশ।

সাইনফেল্ড (Seinfeld) সিরিজটি এয়ারড হয়েছিলো ১৯৮৯ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু করে ১৯৯৮ সালের মে মাস পর্যন্ত – নয়টি সীজনে সর্বমোট ১৮০ টি পর্ব নিয়ে তৈরি এই সীটকম বিশ বছরের বেশি সময় পার হয়ে যাবার পরেও একইভাবে পেয়ে যাচ্ছে দর্শকদের ভালোবাসা। রোলিং স্টোন, এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি এবং টিভি গাইড একে আখ্যা দিয়েছে সময়ের অন্যতম সেরা সিরিজ হিসেবে। ১৯৯৩ সালে সাইনফেল্ড জিতে নিয়েছিল এমি এওয়ার্ড, পরবর্তী দুই বছরে একাধারে জিতেছিলো গোল্ডেন গ্লোব এওয়ার্ড এবং স্ক্রিন এক্টরস গিল্ড এওয়ার্ড। নব্বইয়ের দশক জুড়ে প্রচুর পুরষ্কার ঝুলিতে উঠেছে এই সিরিজটির। বহু সিরিজ দশকে দশকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছে সাইনফেল্ডের দর্শকপ্রিয় উক্তি বা মুহূর্তগুলো, Curb Your Enthusiasm নামক একটি সীটকমে কয়েকটি এপিসোডে নিজেদের ফিকশনাল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সাইনফেল্ড এক্টররা। ২০২১ সালে সিরিজটি থেকে ইন্সপিরেশন নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি পোস্ট-এপোক্যালিপ্টিক ক্যাটাগরির হরর গেইম।


Leave a Reply