ব্লগ থেকে আয় কতটুকু কঠিন এবং আয়ের রাস্তাসমূহ (পর্ব ০১)

ব্লগ থেকে আয় কতটুকু কঠিন এবং আয়ের রাস্তাসমূহ (পর্ব ০১)

 

ব্লগ থেকে যে আয় করা সম্ভব, সেটা কে না জানে! কিন্তু কিভাবে আয় করা যায়, কিংবা এই ‘সম্ভব’ এর লেভেল ‘অসম্ভব’ এর কাছাকাছি কিনা, তা নিয়ে নতুনদের প্রচুর দ্বিধা দ্বন্দ্ব আছে। না, শুধু নতুনদের নয়, পুরাতনদেরও। অনেক ব্লগাররাই ব্লগ থেকে আয় বলতে শুধুমাত্র ‘গুগল এ্যাডসেন্স’ কেই বোঝে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে গুগল এ্যাডসেন্স আয়ের একটা বড় মাধ্যম। বেশিরভাগ ব্লগারের ভরসা থাকে এটা। কিন্তু এটা ছাড়াও আরো পথ খোলা আছে। ব্লগ থেকে আয় করার সমস্ত পথ সম্পর্কে এই সিরিজে জানানোর চেষ্টা করব। আজকের পর্বে এ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং নিয়ে আলোচনা করা হবে। তবে সরাসরি মূল বিষয়ে  যাওয়ার আগে এই উপার্জনের বিষয়টা সম্পর্কে আপনার মনের কিছু প্রশ্ন দূর করা প্রয়োজন।

ব্লগ থেকে আয় কতটা কঠিন?

মনে করুন, আপনি একটি ব্যবসা শুরু করতে চাইছেন। হতে পারে ব্যবসাটা জামা কাপড়ের কিংবা খাবারের কিংবা অন্য যেকোনো কিছুর। ব্যবসা শুরু করতে গেলে আপনাকে প্রথমে কি করতে হবে, বলুন তো? প্রথমে অবশ্যই একটা টার্গেট সেট করতে হবে, তারপর পরিকল্পনা করতে হবে এবং শেষে কোমরে গামছা বেঁধে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। তাই না?

একটা নতুন ব্যবসা দাড় করানো কিন্তু মুখের কথা নয়। প্রতিযোগিতাপূর্ণ মার্কেটে নিজের পরিচয় বানাতে প্রথম প্রথম খুব কষ্ট করতে হয়। বার বার হোচট খেতে হয়। পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাড়াতে হয়।

 ব্লগিংও একধরণের ব্যবসা!

তবে এটা ব্যবসা হলেও এখানে এতো ‘রিস্ক’ নেই। আপনাকে এতো বার বার হোচট খেতে হবে না। তবে ধৈর্য ধারণ করতে জানতে হবে৷ ধৈর্য না থাকলে ব্লগ থেকে আয় তো দূরের কথা, ব্লগিং নিয়ে বেশিদূর আগাতেই পারবেন না। কারণ, একটা ব্লগের বয়স যত বাড়ে, তার মান ততই বাড়তে থাকে।

ব্লগিং শুরু করার সময় এটাকে খুব কঠিন মনে হবে। কিন্তু আপনাকে চোখ কান বুজে কাজ করে যেতে হবে। ঠিকঠাক মতো কনটেন্ট লিখার পরও যদি ৩ মাসে সব মিলিয়ে ৩৩ জন ভিজিটর পান, তবে বুঝতে হবে, আপনি সঠিক পথে আছেন। এভাবেই আগাতে হবে।

কিন্তু কিছুদিন পর আর এমন থাকবে না। আপনার ওয়েবসাইটে আস্তে আস্তে ভিজিটর বাড়তে শুরু করবে। যেহেতু ভিজিটরকে দেয়ার মতো যথেষ্ট খাবার (মানে কনটেন্ট) আপনি এতোদিনে তৈরী করে রেখেছেন, তাই এবার কাজে একটু ঢিলা দিলেও সমস্যা হবে না। তবে একদম বন্ধ করে দিলে চলবে না। হাল্কা আঁচে হলেও তাপ দেয়া চালিয়ে যেতে হবে। নিয়মিত লেখা দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। নতুন ভিজিটরদের আপনার ব্লগের প্রতি বিশ্বস্ততা জমিয়ে দিতে হবে। তাহলেই আর ব্লগ থেকে আয় খুব বেশি কঠিন মনে হবে না। ভিজিটরদের দেখে আপনি প্রেরণা পাবেন।

ব্লগের মাধ্যমে উপার্জন অন্যান্য উপার্জন পদ্ধতির মতো এতো কঠিন এবং সাময়িক ব্যাপার নয়৷ ব্লগে ভালো মানসম্মত কনটেন্ট লিখা বজায় রাখলে, আজ না হোক কাল আপনি গুগলে পজিশন পাবেনই। তখন এতোদিন যা যা লিখে রেখে এসেছেন, সেগুলোর থেকে সুদে আসলে ফায়দা পেতে থাকবেন। পাশাপাশি, আপনার পকেট ভরতেই থাকবে।

ব্লগ থেকে আয় অনেকটা বাড়ি তৈরী করে ভাড়া দেয়ার মতো। বাড়ি তৈরীর সময় আপনাকে ইনভেস্ট করতে হবে, শ্রম দিতে হবে। কিন্তু একবার বাড়ি দাড়িয়ে গেলে বাড়িভাড়া নিয়েই দীর্ঘদিন বসে খেতে পারবেন।

ব্লগ থেকে আয় করতে চাইলে যা জানতেই হবে

ব্লগ থেকে আয় করতে হলে অবশ্যই একটা ভালোমানের ব্লগসাইট বানাতে হবে। এখানে ভালো মানের ব্লগসাইট বলতে বোঝানো হচ্ছে–

  • Fast Loaded (যেহেতু সার্চ ইঞ্জিনগুলো এটাকে খুব গুরুত্ব দেয়)
  • SEO Friendly (সার্চ ইঞ্জিনগুলো থেকে অর্গানিক ভিজিটর আনতে ওয়েবসাইটের Seo Friendly স্ট্রাকচারের কোনো বিকল্প নেই।
  • Mobile Friendly (যেহেতু বেশির ভাগ মানুষ মোবাইল ব্রাউজিং করে)
  • Responsive (ভালো ছিমছাপ ডিজাইন যে কোনো ভিজিটরকে আকর্ষিত করতে পারে)

একটা ব্লগের স্বার্থকতা সুন্দর কনটেন্টে। কনটেন্ট যদি ভালো হয়, তবে ভিজিটর একদিন আসবেই। বুঝতে হবে– ভালো মধু থাকে যেখানে, মৌমাছিরা সেখানে আসতে বেশি সময় নেয় না। ভিজিটর হলো মৌমাছি, আর কনটেন্ট হচ্ছে মধু। আর আয়ের যে পথই আপনি বাছাই করেন না কেনো, ভিজিটর ছাড়া কোনো পথই সম্ভাবনাময় নয়।

ব্লগ থেকে আয়ের রাস্তাসমূহ

অনেকভাবে ব্লগ থেকে আয় করা যায়। এটা পুরোপুরি নির্ভর করে ব্লগের মালিক বা ব্লগারের সৃজনশীলতার ওপর৷ তবে কিছু প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ব্লগার প্রতি দিন প্রচুর অর্থ উপার্জন করে চলেছেন৷ এখানে সেরকম কিছু অতি প্রচলিত পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।

1. Affiliate Marketing

Affiliate Marketing হলো কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে প্রমোট করে টাকা ইনকাম।

মনে করুন, আপনি একজন ব্লগার৷ আপনার ব্লগের বিষয় হলো বিভিন্ন বইয়ের রিভিউ দেয়া। আপনি Affiliate Marketing এর মাধ্যমে ব্লগ থেকে আয় করতে চাইলেন। এজন্য কোনো পাবলিকেশনের কাছ থেকে লিংকসহ ব্যানার বা ছবি নিয়ে সেটা আপনার ব্লগে প্রচার করতে হবে। আপনার প্রচার করা ব্যানারে বা ছবিতে ক্লিক করে যদি কেউ ওই পাবলিকেশনের ওয়েবসাইটে ঢুকে কোনো বই কেনে, তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ কিছু টাকা আপনাকে দেয়া হবে। কারণ বইটা কিনতে আপনি ওই ভিজিটরের মধ্যে আগ্রহ জন্মে দিয়েছেন।

ইউটিউবে দেখবেন বিভিন্ন চ্যানেলের এ্যাডমিন ভিডিও শুরুর আগে কিংবা মাঝে “তাদের Description বক্সে দেওয়া লিংকে” ক্লিক করে কোনো প্রোডাক্ট কিনতে বলে। এর কারণ সে Affiliate Marketing এর সাথে যুক্ত। কিন্তু সে মার্কেটিং করছে ভিডিওর মাধ্যমে, আর আমরা করবো লেখা কিংবা ছবি বা ব্যানারের মাধ্যমে।

Affiliate Marketing এ শুধু পণ্য ‘কিনতে’ আগ্রহী করিয়েই নয়, বরং ভিজিটরদের দিয়ে ছোট ছোট কাজ করিয়েও উপার্জন করা যায়। যেমন লিংকে ঢুকে কোনো ওয়েবসাইটে ইমেইল দিয়ে সাবস্ক্রাইব করা, রেজিষ্ট্রেশন করা কিংবা জাস্ট এ্যাডে ক্লিক করা।

বর্তমানে Affiliate Marketing খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, এর জনপ্রিয়তাও ততই বাড়তে থাকবে। আপনি চাইলে এভাবে মার্কেটিং করতে পারেন। তবে এর জন্য অবশ্যই আগে আপনার ব্লগে কিছু ভিজিটর থাকতেই হবে। আর ভিজিটর আনার জন্য ভালো ভালো কনটেন্ট বানাতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, আপনার ব্লগের বিষয়ের সাথে আপনার প্রচার করা পণ্যের মিল থাকতে হবে। বই রিভিউয়ের ব্লগে অবশ্যই বই সম্পর্কিত পণ্যই প্রচার করতে হবে। তাহলে ভিজিটরদের পণ্য কেনার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।

জনপ্রিয় কিছু Affiliate নেটওয়ার্ক ওয়েবসাইটঃ

মার্কেটিং শুরু করবেন কিভাবে?

  • বেশ কিছু ওয়েবসাইটের নাম ওপরে দিয়েছি। এগুলোর বেশিরভাগই আমি ব্যবহার করিনি। গুগলের র‍্যাংকে থাকা ওয়েবসাইট এগুলো। আপনি নিজেই খোঁজ খবর নিয়ে এগুলোর মধ্য থেকে আপনার জন্য সুবিধাজনক একটি ওয়েবসাইট পছন্দ করুন।
  • পছন্দের ওয়েবসাইটটি বিশ্বস্ত কিনা সেটা জানার চেষ্টা করুন।
  • বিশ্বস্ত মনে হলে সেটায় গিয়ে আবেদন করুন।
  • ওয়েবসাইটগুলো সাধারণত ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যেই তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়– আপনার ওয়েবসাইটে তারা বিজ্ঞাপন দেবে কিনা।
  • আবেদন গৃহীত হলে ওই ওয়েবসাইটে লগ-ইন করে বেছে নিন আপনার ব্লগের জন্য উপযুক্ত ক্যাটাগরির বিজ্ঞাপন।
  • যে বিজ্ঞানপনটি পছন্দ করলেন, সেটা আপনার ব্লগে যুক্ত করে দেখুন সেটা ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা।
  • বিজ্ঞাপন যুক্ত করার পদ্ধতি খুব সহজ। তারপরেও আপনি নিজে করতে না পারলে অভিজ্ঞ কারো কাছে সাহায্য চান।
  • বিজ্ঞাপন ঠিকমতো বসাতে পারলে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার হিসেবে আয় করার জন্য আপনি এবার প্রস্তুত। এরপর যখনই কেউ ওই বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে ওদের পণ্যটি কিনবে, আপনি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কমিশন পাবেন।

এভাবে কত টাকা ব্লগ থেকে আয় করা সম্ভব?

আপনার ওয়েবসাইটের কোনো ভিজিটর বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে যদি কোনো পণ্য কেনে, তবে কোম্পানির যত টাকা লাভ হবে, তার ২.৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত আপনি কমিশন পাবেন। তবে ক্ষেত্রবিশেষে এরচেয়েও বেশি পাওয়ার সুযোগ থাকে। আসলে আপনি কত টাকা কমিশন পাবেন, সেটা নির্ভর করে ভিজিটরের কেনা পণ্যটা এবং ওয়েবসাইটের ওপর।

আমার কথা শুনে Affiliate Marketing কে হয়তো আপনার ব্লগ থেকে আয় এর কঠিন একটা পদ্ধতি মনে হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা শুনতে কঠিন মনে হলেও এর থেকে আপনি যত বেশি কামাতে পারবেন, অন্য কোনো পদ্ধতির মাধ্যমে এতো বেশি কামাতে পারবেন না। কিভাবে?

মনে করুন আপনি গুগল এ্যাডসেন্স থেকে আপনার ব্লগে বিজ্ঞাপন দিলেন। ভিজিটর বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলেই আপনার আয় হচ্ছে। কিন্তু কতো? প্রতি একজন ভিজিটরের ক্লিকে সাধারণত ০.০৩-০.০৫ ডলার। এভাবে আয় করতে গেলে প্রচুর ভিজিটরকে এ্যাডে ক্লিক করতে হবে। তারপরই আপনি ১ ডলার পাবেন। কিন্তু Affiliate  Marketing করলে শুধুমাত্র ১ জন ভিজিটরও যদি আপনার বিজ্ঞাপন দেখে কোনো পণ্য কেনে, তবে ঐ একটা পণ্য থেকেই আপনি ১-৩/৪ ডলার কামিয়ে ফেলতে পারেন। তবে এভাবে মার্কেটিং করতে গেলে আপনাকে অবশ্যই কখন কোন পণ্যটি ট্রেন্ডিং এ আছে, সেসব সম্পর্কে খবর রাখতে হবে। মনে রাখবেন, যে পণ্যটি কোম্পানি সবচেয়ে বেশি বিক্রি করতে পারে, সেই পণ্যটির জন্য আপনাকে খুব বেশি কমিশন দেবে না। আর যে পণ্যটা সাধারণত ভিজিটররা কেনে না, সেটা বিক্রি করতে পারলে অনেক কমিশন দিয়ে দেবে। তাই বুঝে শুনে বিজ্ঞাপন বাছাই করবেন।

( শুধুমাত্র এ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং নিয়েই পরে আরো বিস্তারিত লেখা প্রকাশ করা হবে। )

আগামী পর্বে ইনশাআল্লাহ  “ব্লগ থেকে আয়” এর  আরো কিছু রাস্তা যেমন গুগল এ্যাডসেন্স, এ্যাডভার্টাইজমেন্ট, স্পন্সরশীপ ইত্যাদী সম্পর্কে আলোচনা করব।

অনলাইনে আয় নিয়ে আরও ব্লগ পড়ুন এখানে


2 responses to “ব্লগ থেকে আয় কতটুকু কঠিন এবং আয়ের রাস্তাসমূহ (পর্ব ০১)”

Leave a Reply