চন্দ্রগ্রহণ কি এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

চন্দ্রগ্রহণ কি এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

প্রাকৃতিক নিয়মে আমাদের এই পৃথিবীতে অনেক ঘটনা সেই সৃষ্টির আদিকাল থেকেই ঘটে আসছে। মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞানের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে এই ঘটনাগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মানুষ জানতে পারছে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানার আগে এই ঘটনাগুলোকে মানুষ ভৌতিক বলেই মনে করত। এমনই একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হল চন্দ্রগ্রহণ। আজকের ব্লগে আমরা জানতে পারব চন্দ্রগ্রহণ কি এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। আসুন জেনে নেই।

আমাদের আরেকটি ব্লগে আমরা জেনেছি জোয়ার ভাটা কি এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। আশা করি ব্লগটি আপনাদের ভাল লেগেছে। তো চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে জানতে হলে আমাদের কিছু বেসিক বিষয় জানা দরকার। প্রথমে বেসিক জিনিষগুলো জেনে নেই।

সৌরজগৎ কি এবং কিভাবে গঠিত

আমাদের সুন্দর পৃথিবী সূর্য নামের একটি নক্ষত্রের একটি অংশ। এই সূর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সোলার সিস্টেমকেই বলে সৌরজগৎ। সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা ৮টি গ্রহ, এদের উপগ্রহ, বামন গ্রহ, উল্কা, গ্রহাণু, ধুমকেতু ইত্যাদি নিয়ে গঠিত হল আমাদের এই সৌরজগৎ।

সৌরজগতের একটি বেসিক সিস্টেম হল মহাকর্ষ বল, কক্ষপথ এবং আবর্তন। সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং উপগ্রহ নিজস্ব অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে এবং গ্রহগুলো তাদের উপগ্রহ নিয়ে সূর্যের চারদিকে নিজস্ব কক্ষপথে সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণায়মান। এছাড়া সূর্য নিজেও তার গ্রহ, উপগ্রহ নিয়ে ঘুরছে অনন্তকাল।

সৌরজগত

মহাবিশ্বের প্রতিটি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করছে এই আকর্ষণ বলকেই বলা হয় মহাকর্ষ বল। মহাকর্ষ বল নির্ভর করে তার ভর এবং দুরত্বের উপর। ভর বাড়লে আকর্ষণ বাড়ে, দূরত্ব বাড়লে আকর্ষণ কমে। যদিও চন্দ্রগ্রহণের সাথে মহাকর্ষ বলের কোন সম্পর্ক নেই। তবে জোয়ার ভাটার সাথে মহাকর্ষ বলের সম্পর্ক রয়েছে।

পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ এবং চাঁদ বা চন্দ্র পৃথিবীর একটি উপগ্রহ। এখানে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, চাঁদ ঘুরছে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর চারদিকে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরতে সময় নেয় প্রায় ৩৬৫ দিন, পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর একবার আবর্তিত হয় ২৪ ঘন্টায় এবং চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিন করতে সময় নেয় ২৭ দিন ৭ ধন্টা ৪৩ মিনিট।

চাঁদ নিয়ে আরেকটি তথ্য জানা খুব জরুরী তা হল, চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই। শুধু চাঁদ কেন আমাদের এই সৌরজগতের একমাত্র আলোর উৎস হচ্ছে সূর্য। অন্য কোন গ্রহ কিংবা উপগ্রহেরই নিজস্ব কোন আলো নেই। সূর্য থেকে আলো অন্যান্য গ্রহ/উপগ্রহের উপর পরলে তা প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসলেই তা আমরা দেখতে পাই।

চন্দ্রগ্রহণ কি? কেন, কিভাবে হয়?

আগেই বলেছি, চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই। তাহলে সূর্য থেকে আলো চাঁদের গায়ে পরলে সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এলেই আমরা চাঁদকে দেখতে পাই। এখন খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হল চাঁদ এবং সূর্যের মাঝখানে যদি এমন কিছু আসে যার কারনে চাঁদের উপর সূর্যের আলো না পরে তাহলেই আমরা চাঁদকে আর দেখতে পাবনা। আর এমন ঘটনাই হল চন্দ্রগ্রহণ।

এবার একটু চিত্রের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করে দেখি। আমরা একটু আগেই জেনেছি, পৃথিবী এবং চাঁদ সূর্যের চারদিকে নিজ নিজ কক্ষপথে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। এরকম ঘুরতে ঘুরতে এমন অবস্থার তৈরি হয় যখন সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদ একই সরল রেখায় চলে আসে।

চন্দ্রগ্রহণ কি

পৃথিবীর আকার চাঁদের চেয়ে বড় হওয়ায় এবং চাঁদ ও পৃথিবী সূর্য থেকে যথেষ্ট দূরে থাকায় যখনই এমন ঘটনা ঘটে সূর্যের আলো চাঁদের গায়ে পরতে পারেনা। পৃথিবী দ্বারা বাঁধাগ্রস্ত হয়। ঠিক উপরের ছবির মতই। ফলে চাঁদকে তখন কিছু সময়ের জন্য দেখা যায়না। পৃথিবীর কোন দর্শক তখন কিছু সময়ের জন্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে দেখতে পায়না। এমন ঘটনাকেই চন্দ্রগ্রহণ বলে।

পৃথিবী সূর্যকে আংশিক ঢেকে দিলে তাকে পৃথিবীর জন্য চাঁদকে আংশিক দেখা যায়না, একে আংশিক চন্দ্রগ্রহণ বলে। আবার পৃথিবী সূর্যকে পুরাপুরি ঢেকে দিলে পুরা চাঁদ দেখা যায়না একে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ বা পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ বলে। পৃথিবীর আকার চাঁদের চেয়ে অনেক বড় হবার কারনে চাঁদ এই দূরত্ব অতিক্রম করতে কিছুটা সময় নেয় তাই চন্দ্রগ্রহণের সময় দুই থেকে তিন ঘন্টা পর্যন্ত হতে পারে।

চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর একটি বর্ণিল ও আকর্ষণীয় মহাজাগতিক ঘটনা। তাই এই চন্দ্রগ্রহনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনেক অভূতপূর্ব ঘটনা।

যদিও পৃথিবীর ছায়া চাঁদকে ঢেকে ফেলে তারপরেও সূর্যের আলো কিছুটা চাঁদের উপর গিয়ে পরে। এই আলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকটাই শোষিত হয়। এই শোষিত আলো যখন চাঁদের উপর পরে তখন চাঁদকে রক্তিম দেখায়। একে ব্লাড মুন বলে।

চন্দ্রগ্রহণের প্রকারভেদ

পৃথিবী থেকে মোট তিন রকমের চন্দ্রগ্রহণ পরিলক্ষিত হয়। এগুলো হলঃ

  • পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ
  • খন্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ
  • পেনাম্ব্রা চন্দ্রগ্রহণ

পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ

যখন চাঁদ, পৃথিবী এবং সূর্য একই লাইন বরাবর থাকে, তখনই পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ সংগঠিত হয়। এসময় সূর্যের আলোকে পৃথিবী সম্পূর্ণভাবে ঢেকে ফেলে। পৃথিবীর ব্যাস চাঁদের চারগুন হওয়ায় পৃথিবীর ছায়ার পরিধিও বেশ বড় তাই চন্দ্রগ্রহণের সময়ও বেশ লম্বা। চন্দ্রগ্রহণের সময়কাল ১০৪ মিনিট ধরে চলতে পারে।

 খন্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ

কখনও কখনও পৃথিবীর ছায়া চাঁদকে আংশিক ঢেকে ফেলে, তখন আমরা চাঁদকে আংশিক দেখতে পাই। এই ঘটনাকে খন্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ বলে। পৃথিবীর ছায়া চাঁদকে কতটুকু ঢেকে ফেলছে তার উপর নির্ভর করে আমরা কতটুকু চাঁদ দেখতে পাব। পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ সচরাচর দেখা না গেলেও খন্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ বছরে দুইবার দেখা যায়।

পেনাম্ব্রা চন্দ্রগ্রহণ

চাঁদ যখন যখন পৃথিবীর পেছেনের হালকা ছায়া অংশ অতিক্রম করে তখনই একে পেনাম্ব্রা চন্দ্রগ্রহণ বলে। এধরনের চন্দ্রগ্রহণ বুঝতে পারা একটু কঠিন। কারণ এই ছায়াচ্ছন্ন অংশ খুব বেশি নয়। ফলে এই চন্দ্রগ্রহণ মানুষের চোখে সেভাবে ধরা পরেনা বললেই চলে।

সাধারণ দিনপঞ্জিতে এর উল্লেখও থাকেনা। তবে পেনাম্ব্রা চন্দ্রগ্রহণের খবর শুধু রাখেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

সুপারমুন কি

সুপারমুন হল চাঁদের এমন একটি দশা বা অবস্থান যখন চাঁদ ও পৃথিবীর অবস্থান সবচেয়ে কম থাকে। চাঁদকে পৃথিবী থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক বড় আর উজ্জ্বল দেখায়। সুপারমুনের তেমন কোন বাংলা প্রতিশব্দ নেই। সুপারমুনের কারনে পৃথিবীতে  ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মত বড় প্রাকৃতিক দূর্যোগ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এখনওপর্যন্ত এই ধরনের কোন দুর্যোগের সংবাদ পাওয়া যায় নাই।

সুপারমুন

নিকট অতীতে ১৯৯৩ সালের সুপারমুনের সময় চাঁদকে ২০ গুন উজ্জ্বল এবং ১৫ গুন বড় দেখা যায়। সুপারমুনের রাতে চাঁদের আলোয় পৃথিবী প্লাবিত হয়। আর সুপারমুনের বিপরীত দশা হল মাইক্রোমুন। এদিন পৃথিবী অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে।

নিকটতম সুপারমুন ১৪ নভেম্বর , ২০১৬ দিকে ঘটেছে। সুপারমুন আবার আগামী ২৫ নভেম্বর, ২০৩৪ সালের দিকে দেখা যাবে। চন্দ্রগ্রহণ কি এবং চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর আশা করি পেয়ে গেছেন।

চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে যত কুসংস্কার

আমাদের দেশ সহ সারা পৃথিবীতে চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে নানা কুসংস্কার প্রচলিত আছে। নিচে এর কিছু উল্লেখ করা হলঃ

  • চন্দ্রগ্রহণ চলাকালে কাঁচা খাবার, ফল ও শাকসবজি খেতে বারন করা হয়। এ সময় নাকি চাঁদ থেকে নির্গত রশ্মি খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দিতে পারে, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
  • মাংসজাতীয় খাবার খেতে বারন করা হয়। কারণ চন্দ্রগ্রহণের সময় হজম হতে দেরি হয়। এটিও ভিত্তিহীন কথা।
  • চন্দ্রগ্রহণের আগে খাবার রান্না করে না রাখাই ভাল বলা হয় যা আসলেই ভিত্তিহীন।
  • অনেকের মতে চন্দ্রগ্রহণের পরপর গোসল করে নেয়া উচিত।
  • বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন অনেকেই।
  • ছুরি- কাঁচির ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলেন অনেকেই।
  • খাবারে হলুদ ব্যবহার করতে মানা করে থাকেন।
  • খালি চোখে চন্দ্রগ্রহণ দেখতে বারন করা হয়। যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখতে কোন বাধা নেই।
  • অনেকের ধারণা চন্দ্রগ্রহণের সময় চন্দ্রগ্রহণ দেখলে অন্তঃসত্তা মহিলাদের ক্ষতি হয়ে থাকে। যা ভুল ধারণনা।
  • অনেকেই চন্দ্রগ্রহণের সময় খাওয়া বা পান করা থেকে বিরত থাকতে বলেন যা ভিত্তিহীন।

ইসলাম ধর্মীয় দৃষ্টিতে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ

প্রতিনিয়ত মহান আল্লাহর অস্তিত্বের জানান দিতে থাকা দুইটি বিশাল সৃষ্টি হল চন্দ্র ও সূর্য। জাহেলি যুগেও সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন রকম ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত ছিল। চন্দ্রগ্রহণ কিংবা সূর্যগ্রহণ হলে তখনকার মানুষ মনে করত, অচিরেই দুর্যোগ-দুর্ভিক্ষ ধেয়ে আসবে পৃথিবীর বুকে। আগের দিনের মানুষ চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণকে পৃথিবীতে কোনো মহাপুরুষের জন্ম বা মৃত্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত মনে করত। প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) সেগুলোকে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

আমাদের পবিত্র কোরআনে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে সূর্য ও চন্দ্র। পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই সত্তা, যিনি সূর্যকে কিরণোজ্জ্বল ও চাঁদকে স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত করেছেন। ’ (সুরা ইউনুস : ৫) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি সৃষ্টি করেছি একটি প্রজ্বলিত বাতি। ’ (সুরা নাবা : ১৩)

প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) গ্রহন নিয়ে সকল কুসংস্কারকে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মুগিরা ইবনু শুবা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুত্র ইবরাহিমের ইন্তিকালের দিনটিতেই সূর্যগ্রহণ হলে আমরা বলাবলি করছিলাম যে নবীপুত্রের মৃত্যুর কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে।

এসব কথা শুনে নবীজি (সা.) বললেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহ তাআলার অগণিত নিদর্শনের দুটি। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ হয় না। ’ (সহিহ বুখারি : ১০৪৩)

চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণকে আল্লাহ তাআলার কুদরত হিসেবে অভিহিত করে অন্য হদিসে নবীজি (সা.) সাহাবিদের চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণের সময় নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো লোকের মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তবে তা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনগুলোর দুটি। তোমরা সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হতে দেখলে নামাজে দাঁড়িয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি : ৯৮৪)

আশা করি চন্দ্রগ্রহণ কি এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি তা আপনারা সবাই বুঝতে পেরেছেন। সব্বাইকে ধন্যবাদ।


Leave a Reply