আমার জীবন থেকে নেয়া কিছু কথা পর্ব-০৪ ( সততা )

আমার জীবন থেকে নেয়া কিছু কথা পর্ব-০৪ ( সততা )

 

সততা যেকোন ধর্মের, যেকোন গোত্রের, যেকোন বর্ণের মানুষের মধ্যে থাকতে পারে। সৎ হবার জন্য আপনাকে কোন বিশেষ ধর্মের অনুসারি হবার দরকার নাই। আপনি যে ধর্মেরই হোন না কেন আপনি চাইলেই নিজেকে একজন সৎ ও বিবেকবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। আমার জানামতে পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম নাই যে ধর্ম আপনাকে অসৎ হতে শেখায়। সকল ধর্মই সততার চর্চা শেখায়।

আগের পর্বগুলো (পর্ব-০১, পর্ব-০২, পর্ব-০৩) মালেশিয়ার ঘটনা থেকে লেখা, এবারের পর্ব-০৪ লিখেছি মায়ানমারের কিছু ঘটনা নিয়ে। যারা আগের পর্বগুলো পড়েন নাই, চাইলে পড়ে আসতে পারেন, আশা করি ভাল লাগবে।

২০১৬-২০১৭ সালে আমি মায়ানমারে ছিলাম পুরো এক বছর, সেসময়ের কিছু ঘটনা আজকে আপনাদের সাথে শেয়ার করব। আশা করি ভাল লাগবে। তো শুরু করা যাক,

প্রথমবার মায়ানমারে যাই এপ্রিল ২০১৬ তে। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি জেডটিই (ZTE) অফিসে, সেখানে গিয়ে দেখা করি শামিম ভাই (৯৯ ব্যাচ, রুয়েট) এর সাথে এবং জয়েন করি। অফিস শেষে তার সাথেই চলে যাই তিনি যেখানে থাকেন সেখানে। গিয়ে দেখি মটোরোলার কলিগ শোয়েব ভাইয়ের  অফিস কাম বাসা। ১১ তলায়। দুই দিন সেখানে থেকে অফিস করার পর মায়ানমারের ওয়াটার ফেস্টিভ্যালের ছুটি হয়ে গেল ১২ দিন। সবাই ছুটিতে বাংলাদেশ চলে যাচ্ছে, আমি একা হয়ে গেলাম পুরো বাসায়। লম্বা ছুটি, কিচ্ছু করার নাই। একবার ভাবলাম আমিও চলে যাই কিন্তু সিংগেল এন্ট্রি ভিসা হওয়ার কারনে যেতে পারলাম না। একবার দেশে এলে ছুটিতে আর ভিসা এরেঞ্জ করা সম্ভব না, তাই রয়ে গেলাম। ওহ হ্যা, শামিম ভাই আমার আগের ম্যানেজার, তার সুবাদেই মায়ানমার জেডটিই (ZTE) তে জয়েন করা।

ইয়াঙ্গুন শহর
ওয়াটার ফেস্টিভ্যালঃ ইয়াঙ্গুন শহর (সুলে প্যাগোডার সামনে)

২/৩ দিন পর আর একা রইলাম না। মান্ডালে থেকে মশিউর (৯৭ ব্যাচ, কুয়েট) ভাই চলে আসল। গৌতম দা আগে থেকেই ছিল। সময় কেটে যাচ্ছিল ভালই। সাথে ওয়াটার ফেস্টিভাল ত আছেই। এর পরে ছুটি শেষ হবার তিনদিন আগেই চলে গেলাম মান্ডালে, মায়ানমারের প্রাচীন রাজধানী। সেখানে দুই দিন থেকে চলে গেলাম আমার কর্মস্থল মাগওয়েতে। মান্ডালে গিয়ে দেখা হল দ্য আয়রন ম্যান আকবর ভাই (৯৯ ব্যাচ, রুয়েট) আর উথুন ভাই (৯৫, বুয়েট) এর সাথে।ঘুরা ঘুরি করে সময় ভালই কাটছিল।

Su Taung Pyae Pagoda
মান্ডালেতে কোন এক বিখ্যাত প্যাগোডাঃ বাম থেকে উথুন ভাই, মশিউর ভাই, আমি আর আকবর ভাই।

আমি আসলে যে গল্পটা বলব সেটা বলতে গিয়ে উপরের শানে নাজুল বলে নিলাম। কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ আমি করব যেগুলো আমাকে নাড়া দিয়েছে।

ঘটনা-০১ঃ মসজিদের স্যান্ডেল চুরি

ইয়াঙ্গুনে এবং মাগওয়ে থাকাকালীন সময়ে আমি যে কয়বার মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েছি কাখনই আমি স্যান্ডেল কিম্বা জুতা ভেতরে নেই নি। বলা বাহুল্য মসজিদ ভর্তি মানুষ, এমন নয় যে মসজিদ পুরাই ফাকা। শুধু আমি না কেওই দেখলাম তার স্যান্ডেল নিয়ে চিন্তিত নয়- কারন একটাই এখানে কোন স্যান্ডেল চোর নাই, তাই স্যান্ডেল নিয়ে কারো কোন টেনশনও নাই। সততার নমুনা দেখেন।

ঘটনা-০২ঃ বাসার বাইরে জেনারেটর

মাগওয়ে শহরে প্রচন্ড গরম এবং প্রতিদিন কম করে হলেও ২/১ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকত না। এত গরম যে বিদ্যুৎ চলে গেলে গরমে থাকতে না পেরে অফিস থেকে প্রায়ই বের হয়ে যেতাম, বাইরে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কোল্ড ড্রিংক্স খেতাম। আমার বাসাটা ছিল ডুপ্লেক্স। আমি, জুনায়েদ ভাই (৯৭, কুয়েট) সহ দুই পাকিস্থানি আর এক নেপালি থাকতাম। ঘটনা হল, আমরা প্রথমেই একটা জেনারেটর ভারা নিলাম। মাসিক হিসেবে খুবই সস্তা দরে।

যেদিন জেনারেটর ইন্সটল করে দিতে আসল দেখি ব্যাটা বাসার গেইটের বাইরে জেনারেটর সেট করছে, আমি বললাম ভাই, বাইরে লাগাচ্ছ চুরি হয়ে যাবে তো? বার্মিজ লোকটা বলল কোন সমস্যা নাই, কিচ্ছু হবেনা। কে নেবে এই সামান্য জেনারেটর?

পাকিস্থানি কলিগ মুবাশশেরকে বললাম তোমার দেশ হইলে কি হইত? মুবাশশের বলল ভাই, নিচ থেকে সেট করে উপরে গিয়ে বারান্দা দিয়ে তাকালে আর জেনারেটর দেখা যাবে না। আমিও আমার প্রিয় দেশ বাংলাদেশের অবস্থাটা স্বীকার করে নিলাম।

জেনারেটর পুরো গরম কাল আমাদের সার্ভিস দিল বাইরে থেকে, কেও হাতও দেয় নাই। এদের সততা দেখে অবাক হলাম।

মাগওয়ে টীম
মাগওয়ে টীমঃ আমাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব আপনার

ঘটনা-০৩ঃ বুড়ির সততা

আফিস থেকে আসার পথে আমি আমার বাসা থেকে ১০০ গজ সামনের ফুটপাতের এক বুড়ির দোকান থেকে সবজি কিনতাম প্রায়ই। মায়ানমারের বৃষ্টির কোন বাপ মা নাই, অনেক সময়ই ছাতা নিয়ে অফিসে যেতাম। কোন একদিন সবজি কিনতে গিয়ে বুড়ির দোকানে ছাতাটা ফেলে আসি। ২/৩ দিন বৃষ্টি হয় নাই, ছাতার কোন খোঁজ নেই নাই। ২/৩ দিন পরে বুড়ির দোকানে আবার গেছি সবজি কিনতে দেখি বুড়ির দোকানের সামনে ছাতাটা রেখে দিছে। কার ছাতা সে নিজেও হয়ত জানেনা, কিন্তু প্রতিদিন বাসা থেকে আসার সময় ছাতাটা নিয়ে আসে, যার ছাতা সে যদি আসে তাকে ফেরত দিবে বলে। দেখেন ব্যাপারটা।

আমি তার ভাষা বুঝিনা সেও আমার ভাষা বুঝে না, আকারে ইংগিতে বুঝাইলাম এই ছাতা আমার নিতে চাই। খুশি হয়ে দিয়ে দিল।

ঘটনা-০৪ঃ বাস স্ট্যান্ডে মোবাইল চার্জ

আমি একবার মাগওয়ে থেকে ইয়াঙ্গুন যাচ্ছি, বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছি। দেখলাম একজনের মোবাইলে চার্জ নাই, সে কাউন্টারের এক পোর্টে মোবাইল ফোনে চার্জার লাগিয়ে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। কোন টেনশন নাই। বাস কাউন্টার ভর্তি মানুষ, যে চার্জ দিয়ে গেল তারও কোন টেনশন নাই ার কাউন্টারে যারা ছিল তাদেরও নাই, যত টেনশন শুধু আমার। ভাবতেছিলাম লোকটা কত বেকুব, এভাবে কেও মোবাইল রেখে যায়? পরে শুনেছি এটা এখানে খুবই নরমাল ব্যাপার। এই মোবাইল কেও নিবেনা। ভাবতে পারেন?

ঘটনা -০৫ঃ ইয়াঙ্গুনে কার পারকিং

ইয়াংগুনের বেশিরভাগ বাড়ি অনেক আগের হওয়ার কারনে তাদের বাড়িতে কোন কার পারকিং নাই। আর রেসিডেন্সিয়াল এলাকায় যত বাড়ি দেখেছি কারই পারকিং সুবিধা নাই। নতুন গড়ে ওঠা এপার্টমেন্ট আর কন্ডো গুলোতে অবশ্য পারকিং আছে বেজ-মেন্টে। তাহলে এরা গাড়ি রাখে কোথায়? এরা গাড়ি রাখে যার যার বাড়ির সামনে, খোলা আকাশের নিচে কোন প্রকার পাহারা ছাড়াই। এবং তাদের কিছুই চুরি হয়না। রাতের বেলা স্ট্রিটগুলোতে গেলে দেখবেন যার যার বাড়ির সামনে সারি সারি গাড়ি পরে আছে, দেখার কেও নাই, ছোঁয়ারও কেও নাই।

মায়ানমারে আমি যেখানে ছিলাম, মোটামুটি গ্রামই বলা চলে। বেশিরভাগ মানুষ গরীব, অশিক্ষিত বলেই আমার ধারনা। কিন্তু তাদের মাঝে আমি যেই লেভেলের সততা দেখেছি, তা আসলেই ভাবা যায় না। আমার কেন যেন মনে হয় তাদের মাঝে যারা শিক্ষিত তারা কিছুটা বাটপার টাইপের, ধারনা নয় ব্যাপারটা সত্যিই হবে। তাহলে কী শিক্ষাই মানুষকে অসৎ করে তোলে, সততা কে দূরে ঠেলে দেয়,  হতেও পারে। আর যে শিক্ষা মানুষকে অসৎ হতে শেখায়, কি দরকার সেই শিক্ষার?

ধন্যবাদ সবাইকে।


3 responses to “আমার জীবন থেকে নেয়া কিছু কথা পর্ব-০৪ ( সততা )”

Leave a Reply