আমার জীবন থেকে নেয়া কিছু কথা পর্ব-০২ (প্রবাস জীবন)

আমার জীবন থেকে নেয়া কিছু কথা পর্ব-০২ (প্রবাস জীবন)

 

আগের পর্ব না পড়ে থাকলে এই লিংকে গিয়ে পড়ে আসেন ভাই। অনেকেই ভাবতেছেন হুদাই আমি কেন এসব লিখতেছি? সময় নষ্ট করতেছি? নারে ভাই। বাংলা আর্টিকেল লিখে টাকা আয় করা যায় নাকি শুনছি। সেই চেস্টায় আছি ভাই। করতে পারলে জানাব। আর এই ব্লগে লিখতে চাইলে রেজিস্ট্রেশন করে লেখা ধরেন। এনি ওয়ে, শুরু করি আজকের পর্ব- আজকের পর্বে মালেশিয়ায় প্রবাস জীবন শুরু এবং  প্রথম এল আর টি ট্রেন ভ্রমন নিয়ে লেখা।

মালেশিয়াতে প্রবাস জীবন শুরু

ঘুম ভাঙে জনির ডাকে, জনি অফিস সরাসরি থেকে এসে আমাদের বাসায় চলে আসে। বিদেশের মাটিতে প্রথম বন্ধুর দেখা। ফ্রেস হয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেল মিলেনিয়াম স্কয়ার যেখানে ওর বাসা সেখানকার এক রেষ্টুরেন্ট (পিকাডিলি) এ খাবার জন্য। আলু-পরাটা দিয়ে কি কি জানি খাওয়াইল মনে নাই এখন আর। তারপর আমাদের পৌছে দিয়ে গেল বাসায়। ওর বাসা আর আমাদের বাসা কাছাকাছি, এক কিলোমিটার হবে হয়ত দুরত্ব।পরের দিন অফিসে যাবার সময় আমাদেরকে তুলে নিয়ে গেল, শুরু হল আমার প্রথম প্রবাস জীবন।

অফিসে প্রথম দিনে কাজকর্ম বুঝে নিলাম। আমার দায়িত্ব ছিল এল্কাটেল-লুসেন্ট এর প্রজেক্ট টীমের কাছ থেকে সাইট বুঝে নেয়া। আমি ছিলাম এম,এস টীমের (Managed Service Team) এক্সেপ্টেন্স ইঞ্জিনিয়ার, সিভিল (Acceptance Engineer, Civil)। বন্ধু আমার সেই টীমের ম্যানেজার।সারাদিন এই সেই করতে করতে দিন চলে গেল। অফিস থেকে ল্যাপটপ, ক্যামেরা, জিপিএস, মোবাইল ফোন, সিম কার্ড, অফিস ২০০৭ এর অরিজিনাল সিডি আর সাথে দিল একটা গাড়ির চাবী। সাইটে যাওয়ার সময় নাকি নিজে ড্রাইভ করে যেতে হবে, হায় আল্লাহ কয় কি? এখন উপায়?

ও হ্যা বলতে ভুলে গেছি, মালেশিয়া যাবার আগেই আমাকে জানানো হয়েছিল ড্রাইভিং শিখে যেতে হবে। ইন্টারভিউতে কইছিলাম ব্যাপার না, ড্রাইভিং পারি। সময় পেয়েছিলাম খুব কম, বনশ্রীর বন্ধু অনুসুর আযম হিমুর নিজের গাড়ি ছিল, ওই আমাকে ২ দিন, ২+২=৪ ঘন্টা আফতাবনগরের রাস্তায় ড্রাইভিং প্রাক্টিস করায়। জ্ঞান বলতে এটুকুই সম্বল। বন্ধু অনুসুর আযম হিমু তোমাকে ধন্যবাদ।

জনি বলল, প্রথম দিন তুই অন্য কারও সাথে গিয়ে একটা সাইট ভিজিট করে আয়। পরেরদিন পর থেকে নিজেই করিস। আমি মনে মনে বলি একদিনের জন্য তো বাঁচলাম, ড্রাইভিং করার দরকার হচ্ছে না। যার সাথে সাইটে যাব ওকে বললাম কালকে তোমার সাইট কই, সে বলল, আমি যেন কাল সকালে নয়টার মধ্যে কুয়ালালামপুরের টুইন টাওয়ারের সামনে থাকি। সাইট এর আসে পাশেই। বন্ধু কইল তাইলে তুই এল,আর, টি (LRT) তে চলে যা। এল,আর, টি (LRT) কি জিনিস আর ক্যামনে চালায় কিভাবে যাব কিছুই না বুঝে বললাম ওকে দোস্ত। পরে অবশ্য জনি বলে দিছে। এল আর টি হচ্ছে আমাদের ঢাকাতে যে মেট্রো রেল হচ্ছে ঠিক এই জিনিসটাই। মালেশিয়াতে বলে এল আর টি (Light Rail Transit).

ওইদিন জনি ও অন্যান্যদের সাথে লাঞ্চ করলাম। রেষ্টুরেন্টের নাম লিমা বিনতাং। ইন্ডিয়ান তামিল রেষ্টুরেন্ট। মালেশিয়ান ভাষায় লিমা মানে ফাইভ আর বিনতাং মানে তারা। মানে লিমা বিনতাং মানে ফাইভ স্টার। বাংলাদেশি টাকা ১৩০/৪০ টাকায় ৩/৪ আইটেম দিয়া ভাত খাইলাম। মনে করে দেখেন আগের রাতে কিন্তু ভাত খাই নাই। শান্তি রে ভাই।

পরের দিন সকাল সকাল আমার বাসা থেকে এশিয়া জায়া স্টেশনে গেলাম। দেখি টিকেট কাটার ৩টা সিস্টেম- একটা ম্যানুয়াল, আমাদের মত, একটা হল এটিএম বুথের মত টিকেট ভেন্ডিং মেশিন আর আরেকটা হল টাচ এন্ড গো কার্ড সিস্টেম- একপ্রকার ডেবিট কার্ড। টাচ করলে অটোমেটিক টাকা কেটে নেয়। আমি ম্যানুয়ালই কাটলাম। টিকেট নিলাম আর অপেক্ষা করতে লাগলাম, দেখি কে কিভাবে যায়? কই ছিলাম আর কই আইলাম? মনে হচ্ছে গেরাম থেইকা আইছি। বোকা বোকা আবুল লাগতেছে নিজেরে।

টিকেট ভেন্ডিং মেশিন
টিকেট ভেন্ডিং মেশিনঃ বড় নোট দিলে বাকি খুচরা টাকাও ফেরত দেয় অটোমেটিক (ছবিঃ ইন্টারনেট)

যাইহোক, দেখলাম সবাই যাচ্ছে, আমিও রওয়ানা দিলাম পিছে পিছে লাইনে। ঢুকার সময় সবাই দেখি টিকেট মেশিনে দিচ্ছে, আমিও দিলাম দিয়ে ঢুকে গেলাম ওদের সাথে সাথে। হাটা দিলাম। পিছন থেকে দেখি পুলিশ বা সিকিউরিটি আমাকে ডাকতেছে, কীরে ভাই কি ভুল করলাম আমি? ফিরলাম। ওমা, যেই টিকিট মেশিনে দিছিলাম ওইটা আবার সামনের দিক দিয়া বের হইছে, ঐটা নাকি সাথে নিয়া যাইতে হবে, ব্যাটা কয় কি? যাই হোক নিয়া নিলাম সাথে যা হয় পরে হবে।

অবাক ব্যাপার দেখি, স্টেশনে ৫ মিনিট পর পর ট্রেন আসে, সম্ভবত ২ টা করে বগি। বসার সিস্টেম শুধু প্রেগন্যান্ট, ডিজেবল আর সিনিয়ার সিটিজেনদের। বাকিরা দাড়ায়া থাকবে। ৩০ সেকেন্ড দরজা খোলা থাকে মনে হয় এর পরেই বন্ধ হয়ে যায় একাই। আমি মুখস্ত করে আসছি কয়টা স্টেশন পরে নামতে হবে, খালি গুন্তেছি। ১১ নাম্বারটায় আমি নামব। দেখলাম ভয়ের কোন কারণ নাই। ট্রেনের ভেতরে মাইকে অনবরত রেকর্ড বেজেই যাচ্ছে, কোন স্টেশনে আইল ট্রেন। ডিজি মোবাইলের সৌজন্যে।

ট্রেন কখন যে মাটির উপর দিয়া, কখন  নিচে দিয়া আর কখন যে টানেল দিয়া যাচ্ছে কিছুই বুঝতেছি না। ট্রেনে নাই কোন ড্রাইভার নাই কোন হেল্পার, কীরে ভাই। একবার দেখলাম এক বিল্ডিং এর মাঝখান দিয়া ফুটা কইরা ঢুইকা গেল। সত্যি ভাই ঠিকি পড়ছেন। মানে ব্যাপারটা হল, যখন ট্রেন লাইন এর প্লানিং করে এই বিল্ডিংটা তার আগেই করা, তাই তারা বিল্ডিংটা না ভেঙ্গে মাঝ দিয়া ঢুকাই দিছে, ক্যান ইউ ইমাজিন? আমরা হইলে কী করতাম? ভেবে দ্যাখেন ব্যাপারটা।

কেরিঞ্চি ইস্টেশন
কেরিঞ্চি ইস্টেশনঃ প্লাজা পান্তাই এর ভেতর দিয়ে চলে গেছে। (ছবিঃ ইন্টারনেট)

আমি সারা রাস্তা কুয়ালালামপুরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যাচ্ছি। আহা কত সুন্দর গুছানো। কত সুন্দর রাস্তা। কত হাই রাইজ বিল্ডিং।

প্রায় ১৬ কিলোমিটার রাস্তা মত ২০ মিনিটে পৌছে গেলাম। টিকেট টা গেটে ঢুকাই দিয়া বের হইয়া গেলাম কে এল সি সি স্টেশন থেকে। বের হয়ে রাস্তা পার হলেই টুইন টাওয়ার, কিন্তু আমার দেখার টাইম নাই। কলিগরে ফোন দিলাম,ফোনে আমারে কইল রাস্তা পার হইয়া, এইদিক দিয়া আইসা অইদিকে মোচড় দিয়া ডাইনে কাইত হইয়া দেখ একটা রেষ্টুরেন্ট আমি নাস্তা করতেছি। তারে পাইলাম এক রেষ্টুরেন্টে নাস্তা করতেছে, যাক বাবা সহজেই পাওয়া গেল। ভাবতেছিলাম খুইজা পাই কি না পাই। ব্যাটার সাথে চা খাইলাম চা কে এখানে বলে তে আইছ- খাটি বাংলায় আসলে বরফ দেয়া দুধ চা। এই কলিগের নামটা ছিল সম্ভবত সুব্রামানিয়াম, ডাক নাম সুব্রা। বলতে ভুলে গেছি।

রাস্তা পার হতে চাইলে আপনি কি করবেন? হাত দেখায়া গাড়ি থামায়া রাস্তা পার হবেন? ঢাকায় ত আমরা তাই করি ভাই। রাস্তা পার হবার জায়গায় কিছু খাম্বা আছে, সুইচ টিপ দিবেন কিছুক্ষন পরে লাল বাতি জ্বলবে, গাড়ি থামবে আপনি পার হবেন রাস্তা। আমাদের গুলশান ১ নাম্বারেও দেখছি এই সিস্টেম আছে। খুব ব্যবহার করি আমরা। হাহা হা হহা। এখন মনে হয় অকেজো হয়ে গেছে।

ওর সাথে সাইট ভিজিট করলাম, আবার শেষে বাসায় ফিরলাম। আহা কি শান্তি! প্রবাসে আমার প্রথম সাইট ভিজিট সম্পন্ন হল। আলহামদুলিল্লাহ।

আজকের পর্বের কিছু জিনিস যেগুলো মার্ক করার মত মনে হইছে আমার কাছে-

  • নতুন কোথাও কিভাবে যেতে হয়, এটা আমাদের সময়ের ইংরেজি বইয়ে ছিল। মনে করে দেখেন ভাই। রাস্তার ডিরেকশন কিভাবে দিতে হয়, তারেক ইটালি গেল পিতজা আর স্পাগেটি খাইল, তারেক সামিরার প্রেম ইত্যাদি ইত্যাদি এইবার মনে পড়ছে না? হুম।
  • ট্রেন লাইন টা যেভাবে একটা বিল্ডিং এর ভিতর দিয়া পাস করছে অসাধারণ। আমরা হইলে নির্ঘাত, সিউর থাকেন ১০০০%, ঐ বিল্ডিং ভাইঙ্গা ট্রেন লাইন করতাম, নইলে ৫ মাইল ঘুরাইয়া কন্সট্রাকশন কস্ট বাড়াইতাম। দুইটাই লাভ, একটাতে পরের ক্ষতি- যেইটাতে নিজের লাভ না হইলেও আরেকজনের লস দেইখা আমরা সুখ পাই। আরেকটা তো ভাই পুরাই লাভ, প্রোজেক্ট কস্ট বাড়লে কমিশন বাণিজ্যও বাড়ে।
  • কার্ড পাঞ্চ করে ট্রেন স্টেশনে ঢুকার গেটের হাইট দুই থেকে আড়াই ফিট। মোগো দ্যাশে হইলে অইয়া মোরা লাফ দিয়াই পার অইতে পারি। কিয়ের টিকেট কাটেন ভাই? ভদ্রতা ভাই ভদ্রতা, আমরা একটা অভদ্র জাতি। ভদ্রতা শিখতে হবে আমাদের।
  • রাস্তা ভাই গাড়ি চলাচলের জন্য। মানুষের হাটার জন্য নয়। আর রাস্তা পারাপার হবার জন্য আপনার রাইট নাই হাত তুলে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হবার। এতে রাস্তায় গাড়ির ফ্লো নষ্ট হয়। জ্যাম বাড়ে। যখন সিগন্যাল পরবে অথবা রাস্তায় গাড়ি থাকবেনা তখন রাস্তা পার হবেন নির্ধারিত জায়গা দিয়ে। হাত তুলে কুত্তার মত দৌড়াইয়া রাস্তা পার হবেন না।

পরের পর্বে প্রবাস জীবন এ সামান্য ড্রাইভিং জ্ঞান নিয়ে ড্রাইভ করে সাইট ভিজিট নিয়ে লিখব। আজকের মত বিদায়। ধন্যবাদ সবাইকে।


5 responses to “আমার জীবন থেকে নেয়া কিছু কথা পর্ব-০২ (প্রবাস জীবন)”

Leave a Reply